
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও এখনো পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো দায় নিরূপণ বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়নি—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই থেকে তিন মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে বা এর উপসর্গ নিয়ে দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত অন্তত ৩০ লাখ শিশু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় নীতিগত পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এই সংকট তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা ক্রয় পদ্ধতি উন্নয়ন বাজেট থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করায় অর্থ ছাড় ও ক্রয়প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, যার ফলে সময়মতো টিকা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই পরিবর্তনের কারণে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে।
বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা হামের প্রাদুর্ভাবের জন্য আগের প্রশাসনের নীতিগত ভুল ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘ সময় টিকা ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা এবং পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে। অন্যদিকে মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তগুলো খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং সংবিধানপ্রদত্ত ‘বেঁচে থাকার অধিকার’-এর ওপর সরাসরি আঘাত। সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক টিকাদান একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। আন্তর্জাতিকভাবেও জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট’-এর আওতায় একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই কমিশন ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট প্রতিরোধে সুপারিশ দিতে পারে। তদন্তে অবহেলা বা অপরাধের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
আইনজীবীদের মতে, প্রয়োজনে দণ্ডবিধির ৩০৪ক ধারায় ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’র অভিযোগ আনা যেতে পারে। পাশাপাশি দুর্নীতি বা আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের আওতায়ও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো উচ্চ আদালতে রিট করে ক্ষতিপূরণ দাবি করার অধিকার রাখে বলেও মত দিয়েছেন তারা।
এদিকে ইতোমধ্যে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে, যেখানে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এছাড়া একটি লিগ্যাল নোটিশে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নিরূপণের আহ্বান জানানো হলেও এখনো সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই শিশুদের সুরক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।