
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-কেন্দ্রিক উত্তেজনা এখন আর শুধু আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই—এর প্রভাব পৌঁছে গেছে ভারতের উত্তর প্রদেশের ফিরোজাবাদে, যা “কাঁচ নগরী” নামে পরিচিত। তাজমহল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহরের অর্থনীতি প্রায় সম্পূর্ণভাবে কাঁচ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।
ভারতের মোট কাঁচের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই আসে এই অঞ্চল থেকে। এখানে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক ছোট ও মাঝারি কারখানায় কাজ করেন, যাদের দৈনিক আয় ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে। এমনিতেই নিম্ন আয়ের এই জনগোষ্ঠী এখন যুদ্ধজনিত মূল্যবৃদ্ধির কারণে আরও চাপে পড়েছে।
কাঁচ উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো উচ্চ তাপমাত্রার ফার্নেস বা চুল্লি, যা সচল রাখতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সেই গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতের আমদানিকৃত গ্যাসের একটি বড় অংশ আসে, যা বর্তমানে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
ফলস্বরূপ, গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অনেক কারখানা মালিক জানিয়েছেন, সরকারিভাবে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ফার্নেস একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা পুনরায় চালু করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। তাই অনেক কারখানা এখন চুল্লি সম্পূর্ণ বন্ধ না করে ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে রাখছে এবং সপ্তাহে কয়েকদিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
এই সংকট শুধু কয়েকটি কারখানার নয়—ফিরোজাবাদের প্রায় ৪০০টিরও বেশি উৎপাদন ইউনিট একই সমস্যার মুখোমুখি। এখানে গাড়ির হেডলাইট থেকে শুরু করে ঝাড়লণ্ঠন, কাঁচের চুড়ি—বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি হয়, যার বার্ষিক বাজারমূল্য ২০ কোটি ডলারেরও বেশি।
যুদ্ধ শুরুর পর অনেক ব্যবসায়ী ২৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত লোকসানের সম্মুখীন হয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচ তৈরির কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানিতে বাধা। অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসত, যার সরবরাহ এখন অনিশ্চিত।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য এই ধাক্কা সামলানো কঠিন। পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে এই খাতে সংকট মানেই বৃহত্তর অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হওয়া।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতে অতিরিক্ত ২৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন। ইতোমধ্যে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে এবং তারা বেতন বৃদ্ধি ও কাজের নিশ্চয়তার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।
যদিও সরকার গুরুত্বপূর্ণ খাতে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করছে, তবে কাঁচ শিল্পের মতো শ্রমনিবিড় খাতগুলো তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও পুরো সরবরাহ চেইন ঠিক হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।