
ডিজিটাল যুগে যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সীমান্তে সামরিক শক্তির পাশাপাশি এখন বড় লড়াই হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে— তথ্য, প্রচারণা, মিম এবং জনমতের মাধ্যমে। ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, সামরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকলেও তথ্যযুদ্ধে ভারতকে চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল পাকিস্তান।
বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারতের “অপারেশন সিন্দুর” ঘিরে ছিল অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের জাতীয়তাবাদী প্রচারণা। বিপরীতে পাকিস্তান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ, রসবোধ এবং দ্রুত পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরিকে প্রধান কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে।
২০২৫ সালের ৭ মে ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর শুধু সামরিক উত্তেজনাই নয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতেও শুরু হয় তীব্র প্রচারণা যুদ্ধ। এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দাবি, পাল্টা দাবি ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, তথ্যযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রতিপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানে প্রভাব তৈরি করা। নিজের পক্ষে থাকা তথ্যকে ভাইরাল করা এবং প্রতিপক্ষের দুর্বলতা নিয়ে অনলাইন আলোচনার পরিবেশ তৈরি করাই এ ধরনের কৌশলের মূল অংশ।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে আত্মসমালোচনামূলক হাস্যরসের ব্যবহার। গ্যাস সংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে পাকিস্তানি ব্যবহারকারীরাই সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করতে থাকেন। একজন ব্যবহারকারীর মন্তব্য— “যুদ্ধ করতে চাইলে রাত ৯টার আগে করুন, কারণ সোয়া ৯টার পর আমাদের গ্যাস থাকে না”— ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিজেদের দুর্বলতা নিয়ে আগে থেকেই হাস্যরস তৈরি করায় ভারতের পক্ষ থেকে একই বিষয় নিয়ে করা সমালোচনা খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং অনলাইন ব্যবহারকারীরা সেসব আক্রমণকে নতুন মিম ও ট্রেন্ডে রূপ দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে ২০১৯ সালের বালাকোট হামলার প্রসঙ্গও উঠে আসে। সে সময় ভারতের দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন উঠলে পাকিস্তান সরাসরি প্রতিক্রিয়ার বদলে ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ভিন্ন মাত্রা তৈরি করেছিল।
২০২৫ সালের সাম্প্রতিক উত্তেজনায়ও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম ইসলামাবাদ দখল বা করাচি বন্দরে হামলার দাবি প্রচার করলেও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত পাল্টা ভিডিও ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুগুলোর একটি ছিল ভারতের রাফায়েল যুদ্ধবিমান নিয়ে বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যম পাকিস্তানের হামলায় রাফায়েল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশ করলে সামাজিক মাধ্যমে “অপারেশন তন্দুর”সহ নানা ব্যঙ্গাত্মক হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হয়ে যায়।
এছাড়া যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়েও অনলাইনে ব্যাপক আলোচনা হয়। ভারত যেখানে মার্কিন মধ্যস্থতার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চেয়েছে, পাকিস্তান সেখানে প্রকাশ্যে ট্রাম্পের প্রশংসা করেছে এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নের কথাও তুলেছে।
ডনের বিশ্লেষণে বলা হয়, পুরো ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে যে ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহ, রসবোধ এবং জনসম্পৃক্ত অনলাইন ন্যারেটিভ অনেক সময় সামরিক শক্তির চেয়েও বেশি প্রভাব তৈরি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রাষ্ট্রীয় প্রচারণার প্রচলিত ধারণাকেও নতুনভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।