
দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য এখন একাধিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ সুদের হারের কারণে ব্যাংকঋণ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে শিল্প খাতে সংকট তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে গত তিন বছরে অন্তত ৪০০টি শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা যায়। বর্তমানে সচল কারখানাগুলোও গড়ে মাত্র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
মামুন রশীদ বলেন, সুদের হার বাড়ার ফলে ব্যবসার ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে উৎপাদন খরচ আর প্রতিযোগিতামূলক থাকছে না। এতে লাভ কমে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়ছে এবং ঋণ পরিশোধে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকঋণের সুদহার বর্তমানে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিকে এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও হ্রাস পেয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পরিবহন ও উৎপাদন খরচে পড়েছে। ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধির ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। একই সঙ্গে এলপিজি সিলিন্ডারের দামও গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, উচ্চ সুদের হার ও নীতিগত সহায়তার অভাবে উদ্যোক্তারা চরম সংকটে পড়েছেন। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রায় বন্ধ হওয়ার অবস্থায় রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমানে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে, আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিম, সবজি, সয়াবিন তেল ও চালের দামও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণনির্ভর ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সংকোচন—এই দুইয়ের কারণে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে এবং নতুন চাকরির সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।
সব মিলিয়ে উচ্চ সুদহার, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে মন্দার কারণে দেশের অর্থনীতি এখন জটিল চাপে রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প খাত ও সাধারণ মানুষের জীবনে।