
ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনায় ভারতের দীর্ঘদিনের ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির অবসান ঘটেছে বলে দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি। তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নয়াদিল্লি এখন কার্যত ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গাজালা ওয়াহাব প্রেস টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ভারত আর আগের মতো কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে না। বরং নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থকে সামনে রেখে দেশটি স্পষ্টভাবে পশ্চিমা বলয়ের দিকে ঝুঁকেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করাই এখন ভারতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। একইসঙ্গে ওয়াশিংটনের কাছে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতেও আগ্রহী নয়াদিল্লি।
এদিকে প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের ইসরাইল নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাকিস্তান ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ব্যবহৃত আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের বড় অংশই এখন তেল আবিব থেকে সংগ্রহ করছে ভারত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ভারতের অবস্থানেও সেই প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রেস টিভির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল উত্তেজনার সময় ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভারত সরাসরি কোনো নিন্দা জানায়নি। এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনিকে ঘিরে বিতর্কিত ঘটনাতেও নয়াদিল্লি নীরব ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
গাজালা ওয়াহাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ না নিলেও কেবল যুদ্ধবিরতি ও শান্তির আহ্বান জানিয়েছে। তার মতে, এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
এছাড়া ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন-ইসরাইলি চাপের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তেল আবিব সফর নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরানে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়ে ভারত আগাম ধারণা পেয়েছিল বলেই শুরুতে তাদের অবস্থান অপেক্ষাকৃত নীরব ছিল।
তবে পরিস্থিতি প্রত্যাশিত দিকে না যাওয়ায় পরবর্তীতে ভারতের কূটনৈতিক বক্তব্যে কিছুটা পরিবর্তন আসে বলেও মন্তব্য করেন ওয়াহাব।
অন্যদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে বহু আলোচিত চাবাহার বন্দর প্রকল্পেও ধীরগতি দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে ভারত আপাতত ইরানে বড় বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এদিকে পাকিস্তানও এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের কৌশলগত অবস্থান জোরদার করছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের ভূমিকা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও ভৌগোলিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান বাস্তবতায় ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। কারণ দেশটি এখন ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ঘনিষ্ঠ কৌশলগত বলয়ের অংশ হয়ে উঠছে।