
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেইজিং বৈঠক ঘিরে কূটনৈতিক উষ্ণতা ও প্রতীকী বার্তা সামনে এলেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ঘোষণা এখনো দেখা যায়নি। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের এই বৈঠকে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং তাইওয়ান ইস্যু গুরুত্ব পেলেও চূড়ান্ত কোনো বড় চুক্তি হয়নি।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেন। হোয়াইট হাউস বৈঠকটিকে “অত্যন্ত ফলপ্রসূ” বললেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো বাণিজ্যিক সমঝোতার ঘোষণা দেয়া হয়নি।
সফরের শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাত। ট্রাম্পের সঙ্গে সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন টেসলা প্রধান ইলন মাস্ক, এনভিডিয়া প্রধান জেনসেন হুয়াং এবং বোয়িংয়ের প্রধান নির্বাহী কেলি অর্টবার্গ। তাদের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেমিকন্ডাক্টর ও এআই প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে এনভিডিয়া প্রধান জেনসেন হুয়াংয়ের উপস্থিতি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ উন্নত চিপ প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই রফতানি নিয়ন্ত্রণ নীতি অনুসরণ করছে। ফলে এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতকে ঘিরে দুই দেশের প্রতিযোগিতা এই বৈঠকের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প দাবি করেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যাশার তুলনায় এ সংখ্যা কম হওয়ায় বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। মন্তব্য প্রকাশের পর বোয়িংয়ের শেয়ারের দামও কমে যায়।
এদিকে দুই দেশ অক্টোবরের বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বহাল রাখার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, উভয় দেশ একটি “বোর্ড অব ট্রেড” গঠনে সম্মত হয়েছে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও শুল্ক ইস্যু নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেয়া হবে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, চীনের বাজার আরো উন্মুক্ত হবে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা হবে। তিনি বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তবে বৈঠকে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে উঠে আসে তাইওয়ান ইস্যু। শি জিনপিং সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান প্রশ্ন ভুলভাবে পরিচালিত হলে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত তৈরি হতে পারে। চীনের মতে, এটি এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়।
প্রযুক্তি খাতে বিরোধও এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশ সীমিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বহাল রয়েছে। অন্যদিকে বেইজিং এসব পদক্ষেপকে নিজেদের শিল্পোন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন, ইরান ইস্যুতে চীন ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করবে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের বেইজিং সফরে কূটনৈতিক উষ্ণতা ও ইতিবাচক বার্তা থাকলেও বড় অর্থনৈতিক অগ্রগতি এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে বাস্তব অগ্রগতি পেতে সামনে আরো কয়েক দফা আলোচনা প্রয়োজন হবে।