
দেশে জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলা এবং মজুদ বাড়াতে জরুরি ভিত্তিতে ডিরেক্ট পারচেজ মেথড (ডিপিএম) পদ্ধতিতে ১২টি বিদেশি কোম্পানিকে তেল সরবরাহের অনুমতি দিয়েছিল সরকার। তবে মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটি কার্যকরভাবে তেল সরবরাহ করতে পারেনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, কার্যাদেশ পাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, নেদারল্যান্ডস, হংকং, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া ও জাপানের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব কোম্পানির ডিজেল, অকটেন ও ক্রুড অয়েল সরবরাহ করার কথা ছিল।
তবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি কোম্পানি পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (পিজি) জমা দিয়েছে। আরেকটি প্রতিষ্ঠান পিজি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ সময় পার করেছে, কেউ সরবরাহে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, আবার কেউ এখনো প্রক্রিয়ায় সক্রিয় নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত মার্চে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বাংলাদেশ সরকার জরুরি ভিত্তিতে দরপত্র ছাড়াই তেল আমদানির উদ্যোগ নেয়। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি ঠেকানো এবং জ্বালানি মজুদ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “কাতার ও সৌদি আরবের মতো কিছু উৎস থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়েছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট ও ডিপিএম পদ্ধতির দিকে যেতে হয়েছে।”
ডিপিএম প্রক্রিয়ায় জমা পড়া বিভিন্ন প্রস্তাবে তেলের দামের মধ্যেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। যেমন দুবাইভিত্তিক একটি কোম্পানি ব্যারেলপ্রতি ১৭৫ ডলারে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দেয়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র ৭৫ ডলারে সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। বিশ্ববাজারের তুলনায় এই দাম অস্বাভাবিক কম হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নও ওঠে।
এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, প্রাথমিক প্রস্তাবিত দাম চূড়ান্ত নয়। প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ হবে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটস রেট অনুযায়ী, যখন তেল লোডিং সম্পন্ন হবে।
তিনি জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মার্চে বেশ কয়েকটি কার্গো স্থগিত হওয়ায় বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে ডিপিএম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। মূল লক্ষ্য ছিল সম্ভাব্য সরবরাহ উৎস চিহ্নিত করা এবং জরুরি অবস্থায় সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা।
বর্তমানে সরকার নতুন করে জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাসের জন্য উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, “এখন আর ডিপিএমে যাওয়া হচ্ছে না। ওপেন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আমরা এগোচ্ছি।”
বাংলাদেশে সাধারণত দুইভাবে জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়—সরকারি চুক্তির (জিটুজি) মাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের (ওটিএম) মাধ্যমে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ডিপিএম বা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয়ের সুযোগ থাকলেও কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “যদি যাচাই-বাছাইয়ে ঘাটতি থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে কোনো বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে কি না। তবে সংকটকালীন সময়ে জাতীয় স্বার্থে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিতেই পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানি প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা জরুরি।