
দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার এই স্বাভাবিক চক্রকে আমরা সবসময় ধ্রুব সত্য হিসেবে জেনে এসেছি। কিন্তু আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, মানুষের কর্মকাণ্ড ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এর ফলে আক্ষরিক অর্থেই দিনগুলো ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মেরু অঞ্চলের বিশাল হিমবাহ ও বরফের স্তর দ্রুত গলে যাচ্ছে। এই গলিত পানির বড় অংশ ধীরে ধীরে বিষুবরেখার দিকে সরে গিয়ে পৃথিবীর ভরের ভারসাম্য পরিবর্তন করছে। ফলে গ্রহটির ঘূর্ণন গতিতেও সামান্য পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।
এই প্রক্রিয়াকে সহজভাবে বোঝাতে গবেষকরা একটি আইস স্কেটারের উদাহরণ দেন। স্কেটার যখন হাত শরীরের কাছে গুটিয়ে নেয়, তখন দ্রুত ঘোরে; কিন্তু হাত ছড়িয়ে দিলে ঘূর্ণন ধীর হয়ে যায়। একইভাবে পৃথিবীর ভর যখন কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায়, তখন এর ঘূর্ণন গতি কমে আসে।
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইটিএইচ জুরিখের গবেষকরা প্রায় ৪০ লাখ বছরের জলবায়ু ও ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পেয়েছেন। তারা সমুদ্রের তলদেশের অতি ক্ষুদ্র জীবাশ্ম ‘ফোরামিনিফেরা’ ব্যবহার করে প্রাচীন জলবায়ুর তথ্য পুনর্গঠন করেন এবং উন্নত এআই মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি শতাব্দীতে দিনের দৈর্ঘ্য গড়ে প্রায় ১.৩৩ মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যে এই ধরনের দ্রুত পরিবর্তন আগে দেখা যায়নি।
এই পরিবর্তন আপাতদৃষ্টিতে খুবই সামান্য মনে হলেও এর প্রযুক্তিগত প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আধুনিক স্যাটেলাইট, জিপিএস এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সময় নির্ভর সিস্টেম অত্যন্ত সূক্ষ্ম সময় গণনার ওপর নির্ভর করে। সামান্য বিচ্যুতিও ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, বরং এটি মানবজাতির পরিবেশের ওপর প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। মানুষের কর্মকাণ্ড যে একটি পুরো গ্রহের মৌলিক গতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে, এই গবেষণা সেটিই স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।