
অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন নীতিগত ব্যর্থতা বর্তমান সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক। তিনি মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিস্থিতির দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
শনিবার অনুষ্ঠিত ‘নতুন সরকারের তিন মাস: প্রাথমিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসি আয়োজিত এই আলোচনায় দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরেন বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা।
ফজলুল হক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে পর্যটন, রপ্তানি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যেও। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ পুরোপুরি তৈরি না হওয়ায় আগামী বাজেটে কঠোর কিন্তু কার্যকর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, নতুন সরকার বর্তমানে অর্থনীতি, প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক—সব দিক থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে মেধাভিত্তিক প্রশাসন ও জবাবদিহিমূলক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনীতিকরণ কমাতে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, প্রশাসনিক নিয়োগে পুরোনো ধারা অব্যাহত রয়েছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও এখনো উদ্বেগের জায়গায় রয়েছে। পুলিশের মনোবল পুরোপুরি ফিরে না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) ড. মোহাম্মদ মাহফুজর রহমান বলেন, ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান বলেন, বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে আগের সরকারের সব উদ্যোগ বাতিল করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ওয়েবিনারের সঞ্চালক পিপিআরসির চেয়ার ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আবেগনির্ভর অবস্থান থেকে তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণের দিকে নিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত করার প্রবণতা জনজীবনকে বিভক্ত করছে এবং সুশাসনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, একটি সফল নির্বাচিত সরকার দেশের সব নাগরিকের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জাতীয় ঐকমত্য গঠনে নাগরিক সমাজ ও ব্যবসায়ী মহলের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।