
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী এবং মৎস্যসম্পদের প্রজননকাল সুরক্ষিত রাখতে আজ সোমবার (১ জুন) থেকে টানা তিন মাসের জন্য বনের অভ্যন্তরে সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর থাকা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি, গোলপাতা সংগ্রহকারীসহ বনজীবী এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক কেউই সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞাকালীন কোনো ধরনের পাস বা পারমিট ইস্যু করা হবে না। পাশাপাশি কেউ অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে বন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর এবার একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন বিভাগ। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র। বন বিভাগের মতে, পশুর নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় করমজলে পর্যটকদের উপস্থিতি বনের মৎস্যসম্পদ, বন্যপ্রাণী কিংবা প্রজনন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে না।
করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি কম থাকায় কেন্দ্রটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুন, জুলাই ও আগস্ট মাস সুন্দরবনের অধিকাংশ মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় বনের নদী-খালগুলো মাছের ডিম ছাড়ার নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ অঙ্কুরোদগম ও নতুন চারা জন্মানোর জন্যও এই সময়কাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, বনজীবীদের নৌযান চলাচল, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, পর্যটকবাহী ট্রলারের শব্দ এবং মানুষের উপস্থিতির কারণে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। তাই পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের স্বার্থে প্রতিবছরের মতো এবারও তিন মাসের জন্য বনে প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ টহল ও নজরদারি জোরদার করা হবে। এ সময় কোনো ধরনের পাস-পারমিট দেওয়া হবে না এবং অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বন বিভাগের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় ৩১ শতাংশ জলভাগ। এই বনাঞ্চলে রয়েছে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি এবং ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। এছাড়া প্রতিবছর ১২ হাজারের বেশি জেলেনৌকা বনে প্রবেশের জন্য বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) গ্রহণ করে এবং দুই লক্ষাধিক দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন।