
অনেকের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে গরুর মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, বিশেষ করে এতে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি থাকায় অনেকেই এটি এড়িয়ে চলেন। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, পরিমিত পরিমাণে ও সঠিক নিয়ম মেনে খেলে গরুর মাংস শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, গরুর মাংসে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি জিঙ্ক, আয়রন, ফসফরাস, সেলেনিয়ামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান রয়েছে। এছাড়া এতে ভিটামিন বি২, বি৩, বি৬ ও বি১২ পাওয়া যায়, যা পেশি, হাড়, দাঁত, ত্বক ও চুলের সুস্থতায় ভূমিকা রাখে। এসব পুষ্টি উপাদান শক্তি উৎপাদন, ক্ষত নিরাময়, দৃষ্টিশক্তি উন্নয়ন এবং রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধেও সহায়ক।
পুষ্টিবিদরা জানান, প্রোটিনের চাহিদা নির্ভর করে একজন মানুষের ওজন ও শারীরিক অবস্থার ওপর। সাধারণভাবে ৫০ কেজি ওজনের একজন সুস্থ মানুষের দৈনিক প্রায় ৫০ গ্রাম প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। তবে কিডনি সমস্যায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই চাহিদা অর্ধেকে নেমে আসে। অন্যদিকে গর্ভাবস্থা বা নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থায় প্রোটিনের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করা উচিত নয়। সাধারণভাবে দিনে ৭০ গ্রামের বেশি এবং সপ্তাহে ৫০০ গ্রামের বেশি প্রোটিন গ্রহণ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রতি ১০০ গ্রাম গরুর মাংসে প্রায় ২৬ গ্রাম প্রোটিন ও সীমিত পরিমাণ ফ্যাট থাকে। তবে একক খাবার থেকে সম্পূর্ণ প্রোটিন চাহিদা পূরণ না করে বিভিন্ন খাদ্য থেকে গ্রহণ করাই স্বাস্থ্যসম্মত বলে মনে করেন পুষ্টিবিদরা।
তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, সপ্তাহে দুই দিন সীমিত পরিমাণে গরুর মাংস খাওয়া নিরাপদ। ওই দুই দিনে মোট তিন থেকে পাঁচ বেলার মধ্যে প্রায় ১৫০ গ্রামের কাছাকাছি মাংস গ্রহণ করা যেতে পারে, যেখানে প্রতি বেলায় ছোট ২–৩ টুকরার বেশি না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গরুর মাংস খাওয়া উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য সীমিত পরিমাণে সপ্তাহে এক থেকে দুই বেলা খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও, ব্যক্তিগত নির্দেশনা মানা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন।
ক্যালরি হিসাব অনুযায়ী, চর্বিহীন গরুর মাংসে তুলনামূলক কম ক্যালরি থাকে। প্রায় ২৫ গ্রাম মাংস থেকে ৬২ ক্যালরি পাওয়া যায়, যা দৈনিক চাহিদার তুলনায় খুবই কম।
অনেকের ধারণা গরুর মাংসে কোলেস্টেরল বেশি থাকে। তবে পুষ্টিবিদরা জানান, একটি ডিমের কুসুমে থাকা কোলেস্টেরল প্রায় ১৯০ মিলিগ্রাম, যা প্রায় ২১০ গ্রাম চর্বিহীন গরুর মাংসের সমান। ফলে গরুর মাংসকে সর্বোচ্চ কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার বলা সঠিক নয়।
গরুর মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে এর প্রস্তুত প্রণালিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তুলনামূলক কম চর্বিযুক্ত অংশ যেমন রাউন্ড ও স্যারলয়েন বেশি উপযোগী বলে ধরা হয়। রান্নার আগে অতিরিক্ত চর্বি কেটে ফেললে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ছোট টুকরো করে কাটা মাংসে ফ্যাটের পরিমাণ কম থাকে। কিমা বা মিহি করে প্রস্তুত মাংসেও তুলনামূলক কম চর্বি থাকে। সেদ্ধ করার পর উপরে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি ফেলে দিলে ঝুঁকি আরও কমে।
রান্নার সময় কম তেল ব্যবহার, লেবুর রস, ভিনেগার বা টক দই ব্যবহার করলে ফ্যাটের প্রভাব কমাতে সহায়তা করে। অতিরিক্ত ভাজা বা বেশি তেলযুক্ত রান্না এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। গ্রিল, শিক কাবাব বা ঝোল কমিয়ে রান্না করলে তা তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর হয়।
গরুর মাংসের সঙ্গে বিভিন্ন সবজি যেমন লাউ, মিষ্টি কুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও পেঁপে যুক্ত করলে খাবারটি আরও সুষম ও স্বাস্থ্যকর হয়।
অতিরিক্ত গরুর মাংস গ্রহণ রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি সমস্যা এবং স্থূলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কিছু গবেষণায় অতিরিক্ত লাল মাংস গ্রহণকে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পুষ্টিবিদদের পরামর্শ, গরুর মাংস সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে পরিমিত পরিমাণে ও সঠিক নিয়মে খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর উপায়।