
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিদিনই নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম এবং হামের উপসর্গে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৩৬ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে এবং ৬৯ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম ধরা পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে ৬০৫ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯১ শিশু এবং হামের উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে আরও ৫১৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় একজন শিশু নিশ্চিত হামে এবং তিনজন হামের উপসর্গে মারা গেছে। একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারাদেশে ৭৫ হাজার ৭০৮ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এ সময় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৯ হাজার ২৬০ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬১ হাজার ১৯৪ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৭ হাজার ৪৩ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
এদিকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, আট মাস বয়সী ওই শিশুর বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকায়। বুধবার দুপুরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় বিকেলে তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ৮৫২ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭১৩ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছে ২৫ শিশু এবং ছাড়পত্র পেয়েছে ৩৬ জন। বর্তমানে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৯৩ শিশু।
ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর ঘটনা চিকিৎসাধীন শিশুদের স্বজনদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি করছে। হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুর স্বজন হামিদা আক্তার বলেন, প্রতিদিন মৃত্যুর খবর শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন তারা। সন্তানের সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন স্বজনরা। তাদের দাবি, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে অনেক শিশুর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতো।
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহা. গোলাম মাওলা জানান, মারা যাওয়া অধিকাংশ শিশুই শুধু হামে নয়, একই সঙ্গে অন্যান্য জটিল রোগেও আক্রান্ত ছিল। ফলে তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জটিলতা বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার রোধে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সক্ষমতা, বিশেষ করে আইসিইউ সুবিধা বৃদ্ধি করা না গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।