
সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ৫১টি ফ্লাইটের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এসব ফ্লাইটের কিছু বাতিল এবং কিছু স্থগিত করা হয়েছে। এর ফলে ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা থাকা ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সোমবার বিকেলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। সংস্থাটির তথ্যমতে, গত শনিবার রাত থেকে সোমবার বিকেল পর্যন্ত এসব ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত করা হয়।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল ও স্থগিত হওয়া ৫১টি ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ফ্লাইট ১২টি। বাকি ৩৯টি ছিল ট্রানজিট ফ্লাইট।
সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চারটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারের তিনটি ফ্লাইট রয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ১৬টি, সালাম এয়ারের তিনটি, ইজিপ্টএয়ারের একটি, এমিরেটসের নয়টি, কাতার এয়ারওয়েজের পাঁচটি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের পাঁচটি ফ্লাইট রয়েছে।
বেবিচকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধের প্রভাব এখন শুধু সরাসরি ফ্লাইটে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ট্রানজিট ফ্লাইটও এর আওতায় পড়েছে। ফলে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদগামী ফ্লাইটগুলো অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা বাতিল করা হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বড় ধরনের হামলার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রিয়াদ বিমানবন্দরে ফ্লাইট স্থগিতের বিষয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের সেখানে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে। একই সঙ্গে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থাও যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটে তাদের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এসব ফ্লাইটের নম্বর বিএস ৩৮১ ও বিএস ৩৮২।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, নতুন করে ফ্লাইটের সময়সূচি নির্ধারণ করা হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের তা জানিয়ে দেওয়া হবে।
সৌদি আরবগামী যাত্রীদের আপাতত বিমানবন্দরে না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ইউএস-বাংলা। ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা, পুনরায় টিকিট বুকিং এবং অন্যান্য তথ্য জানতে বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র বা ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য যাত্রীদের কাছে দুঃখও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ছুটি শেষে সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীরা। নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন তাঁদের কেউ কেউ।
সোমবার দুপুর ২টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সৌদি আরবের দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল আবুল হোসেনের। ফ্লাইট ধরতে তিনি সকাল ১০টার দিকে নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন। সেখানে পৌঁছে জানতে পারেন, তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
আবুল হোসেন জানান, তিনি ছয় বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করছেন। বর্তমানে রিয়াদে টাইলস মিস্ত্রি হিসেবে কর্মরত। তিন মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন এবং ছুটি শেষে ফেরার জন্য তিন মাস আগেই টিকিট কেটে রেখেছিলেন।
ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি। প্রথম আলোকে আবুল হোসেন বলেন, ‘ছুটি শেষ হয়েছে। এখন যাইতে না পারলে চাকরি বাঁচানো যাবে না। সব কিছু অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে।’
একই ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছেন মো. মোসলেম তালুকদার। বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তাঁর রিয়াদগামী ফ্লাইট ছাড়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী সকাল ১০টা থেকে তিনি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন। পরে সেখানে পৌঁছে ফ্লাইট বাতিলের খবর জানতে পারেন।
সোমবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে প্রথম আলোকে মোসলেম তালুকদার বলেন, ‘দুপুর ১২টায় ফ্লাইট ছিল, যেতে পারিনি, বিমান বন্ধ, ফ্লাইট ক্যান্সেল (বাতিল) হয়েছে। এখন দেখছি, অন্য কোনো ফ্লাইটে যেতে পারি কি-না। নইলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে।’
তিনি জানান, রিয়াদের একটি দোকানে তাঁর কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সোমবার বেলা একটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবগামী ১৫ জনের বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁদের অধিকাংশই ফ্লাইট বাতিলের বিষয়ে আগে থেকে জানতেন না। কেউ কেউ বিকল্প ফ্লাইটে গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ঢাকা থেকে ফ্লাইট চলাচলে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের ভ্রমণসূচি ও কর্মস্থলে ফেরার পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।