
এ ধরনের বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমাকে বহুবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রতিবারই না করে দিয়েছি। কারণ, এসব বক্তৃতায় খুব একটা টাকাপয়সা পাওয়া যায় না! (হাসি)
মজা করলাম। আসল কারণ হলো, কখনোই নিজেকে প্রস্তুত মনে হয়নি। নিজেকে বলতাম, ‘আর কয়েকটা বছর যেতে দাও।’ কারণ, মাত্র ১০ মিনিটের এমন একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ জীবনে একবারই আসে।
কিন্তু এবার রাজি হলাম কেন? সত্যি বলতে, আমি জানি না! আজকের বক্তৃতার একটা নাম দিতে হলে সেটি সম্ভবত হতো—‘আমি জানি না!’
অনেকে হয়তো ভাবছ, হিউ জ্যাকম্যান এবার আটটি পয়েন্টে সাফল্যের সহজ সূত্র বলে দেবেন। বলবেন, ‘স্বপ্নের ক্যারিয়ার চান? এই নিন সাফল্যের ফর্মুলা!’
চাইলেই কয়েকটি চমৎকার গল্প সাজিয়ে বলতে পারি—কঠিন লক্ষ্য নির্ধারণ করো, কঠোর পরিশ্রম করো, আর ভাগ্য সহায় হলে তুমিও একদিন সাফল্যের শিখরে পৌঁছে যাবে।
কিন্তু বাস্তব জীবন এত সহজ হিসাব মেনে চলে না। অন্তত আমার জীবনে কখনো চলেনি।
জীবনের বেশির ভাগ সময়ই আমি নিজেই জানতাম না, কী করতে চাই। শুধু ২২ কিংবা ২৭ বছর বয়সে নয়—ছয় মাস আগে, এমনকি গতকালও অনেক বিষয়ে আমার উত্তর ছিল, ‘আমি জানি না।’
ছয় বছর বয়স থেকেই কোনো না কোনোভাবে অভিনয় করতাম। থিয়েটার করেছি, মিউজিক্যাল করেছি, কনসার্টে অংশ নিয়েছি। সবই ছিল শখের বশে। এসব করতে ভালো লাগত, কিন্তু কখনো ভাবিনি অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেব।
১৯ বছর বয়সে একবার মডেলিং এজেন্সিতে নিজের ছবি জমা দিয়েছিলাম। কারণ, আমার এক বন্ধু তখন মডেলিং করে বেশ ভালো টাকা আয় করছিল।
কিন্তু এজেন্সির প্রধান ব্যক্তি আমাকে সরাসরি জানিয়ে দিলেন, ক্যামেরা নাকি আমাকে পছন্দ করে না। আমি দেখতে মোটেও ‘ফটোজেনিক’ নই!
কথাটা আমাকে দীর্ঘদিন হীনম্মন্যতায় ভুগিয়েছে। প্রায়ই মনে হতো, এই জগৎটা হয়তো আমার জন্য নয়।
অভিনয়ে কীভাবে এলাম, সেই গল্প শোনো।
আমি কমিউনিকেশনসে লিবারেল আর্টস ডিগ্রি নিয়েছিলাম। আমার মূল বিষয় ছিল সাংবাদিকতা। তবে ডিগ্রি অর্জনের জন্য যতটুকু পড়াশোনা প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই করতাম।
আশা করি, এই কথা শুনে তোমরা হাততালি দেবে না! মা-বাবা কিন্তু পাশেই বসে আছেন!
বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ বর্ষে আমার ২৪ ক্রেডিট নেওয়ার কথা ছিল। ভুল করে নিয়েছিলাম ২২ ক্রেডিট। ফলে ডিগ্রি শেষ করতে একটি ঐচ্ছিক বিষয় নিতে হতো।
এক বন্ধু পরামর্শ দিল, ‘থিয়েটার অ্যাপ্রিসিয়েশন’ কোর্সটি নিতে। তার মতে, কোর্সটি ছিল সবচেয়ে সহজ। কোনো বাড়ির কাজ নেই, পরীক্ষা নেই—শুধু ১০ সপ্তাহ ক্লাসে উপস্থিত থাকলেই পাস!
আমি বললাম, ‘এই তো চাই! নাম লিখিয়ে ফেলো।’
পড়াশোনার প্রতি আমার আগ্রহ এতটাই কম ছিল যে প্রথম তিন সপ্তাহ ক্লাসেই যাইনি। ভেবেছিলাম, নিয়ম অনুযায়ী তিনটি ক্লাস মিস করলেও পাস করতে সমস্যা হবে না।
চতুর্থ সপ্তাহে ক্লাসে গিয়ে জানলাম, ওই কোর্সের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দিয়ে একটি নাটক করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শুনেই আমার প্রায় টেবিলের নিচে লুকানোর অবস্থা! কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস, দৈবচয়নে নাটকের প্রধান চরিত্রটিই পেয়ে গেলাম আমি।
ক্লাস শেষ হতেই দৌড়ে গেলাম অধ্যাপকের কাছে। অনুরোধ করলাম, এবার যেন আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তিনি বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘প্রথম তিন সপ্তাহ ক্লাসে এলে হয়তো বিষয়টি বিবেচনা করতাম।’
কথা শেষ করেই তিনি চলে গেলেন।
এরপর আমার শেষ বর্ষের প্রায় ৯০ শতাংশ সময় কেটে গেল নাটকটির পেছনে। মূল বিষয় কিংবা বাকি ক্রেডিট নিয়ে আর তেমন মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ হলো না।
একসময় আমরা নাটকটি নিয়ে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শনী করতে গেলাম। সেখানে নাট্যচর্চা করা শিক্ষার্থীদের সঙ্গেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল।
ওই বাড়িতে পা রাখার পর অভিনয়শিল্পীরা আমাদের স্বাগত জানালেন। আর তখনই আমার শরীরের প্রতিটি কোষ যেন বলে উঠল—আমি আমার নিজের মানুষদের খুঁজে পেয়েছি!
মনে হলো, এত দিন ভুল ডিগ্রির পেছনে তিনটি বছর ব্যয় করেছি।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার জীবনের মোড় ঘোরাতে হবে।
সিডনির অ্যাক্টরস সেন্টারে এক বছরের অভিনয় প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তির জন্য অডিশন দিলাম। আসন ছিল মাত্র ২০টি।
প্রথমবার সুযোগ পাইনি। পরে একজন শিক্ষার্থী তাঁর ভর্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে আমাকে আবার অডিশনের জন্য ডাকা হয়।
সেখানে গিয়ে দেখি, শেষ আসনটির জন্য প্রতিযোগিতা করছেন মাত্র আটজন। শেষ পর্যন্ত সুযোগটা আমিই পেয়ে গেলাম।
খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। হাতে যখন ভর্তির চিঠি এল, আনন্দের সীমা ছিল না।
কিন্তু চিঠির শেষ লাইনটি পড়েই মাথায় হাত!
প্রথম দিন ক্লাসে যাওয়ার সময় সঙ্গে সাড়ে তিন হাজার ডলারের একটি চেক নিতে হবে।
তখন আমার কাছে ওই টাকাই ছিল এক মিলিয়ন ডলারের সমান! মাত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি শেষ করেছি, যার খরচও বাবা বহন করেছিলেন। তাঁর কাছে আবার সাড়ে তিন হাজার ডলার চাওয়ার সাহস আমার ছিল না।
তাই মুহূর্তের মধ্যে চিঠিটি ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম।
ভাবতে লাগলাম, এবার কী করব? সবকিছুই যেন ইঙ্গিত দিচ্ছিল—অভিনয় আমার ভাগ্যে নেই।
ঠিক পরদিনই ডাকযোগে একটি চেক পেলাম।
ঘটনা কী?
দাদির উইলে আমার জন্য কিছু টাকা রাখা ছিল। সেই সূত্রে আমি যে অর্থ পেলাম, তার পরিমাণ ঠিক সাড়ে তিন হাজার ডলার!
হ্যাঁ, ঠিক সেই পরিমাণ টাকা, যা অভিনয় প্রশিক্ষণে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল।
আমি শুধু চেকটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম। পুরো ঘটনাটাই মনে হচ্ছিল সিনেমার কোনো দৃশ্য!
এরপর ডাস্টবিন থেকে ছেঁড়া চিঠিটি কুড়িয়ে নিলাম। আর সেখান থেকেই শুরু হলো অভিনয়শিল্পী হয়ে ওঠার যাত্রা।
সেই ফাঁকিবাজ ছেলেটার কথা মনে আছে, যে কোনোমতে পাস করার জন্য পড়াশোনা করত?
সেই ছেলেটি এরপর আর আগের মতো থাকেনি।
অভিনয় প্রশিক্ষণের পরবর্তী চার বছর আমি মন দিয়ে পড়াশোনা করেছি। একটি ক্লাসও মিস করিনি। একটিও না!
এটাকে তোমরা কী বলবে? অলৌকিক সংকেত, অদৃশ্য কোনো সাহায্যের হাত, নাকি প্রার্থনার উত্তর?
চাইলে একে নিছক কাকতালীয় ঘটনাও বলতে পারো। কে জানে, সত্যিটা কী!
জীবনের পথনির্দেশ যেখান থেকেই আসুক, সংকেতগুলো কি সব সময় এত স্পষ্ট হয়? মোটেও না।
অনেক সময় সেগুলো নীরব ও সূক্ষ্ম হয়। কখনো কখনো আমরা সেসব সংকেত চিনতেই পারি না। বরং সেগুলো আমাদের সামনে আসে ব্যর্থতার ছদ্মবেশে।
বিখ্যাত লেখক ও পুরাণবিশারদ জোসেফ ক্যাম্পবেলের একটি বহুল আলোচিত বক্তব্যের ভাবার্থ হলো, জীবনের মই বেয়ে অনেক ওপরে ওঠার পর যদি বুঝতে পারো, মইটি ভুল দেয়ালে ঠেকানো ছিল, তাহলে সেই উপলব্ধির চেয়ে কষ্টের আর কিছু নেই।
তোমার হৃদয়, তোমার ভেতরের সেই ছোট্ট কণ্ঠস্বরই হয়তো তোমাকে বুঝিয়ে দেবে—কোন দেয়ালটি তোমার, আর কোন পথে এগিয়ে যাওয়া উচিত।
জীবনে সব প্রশ্নের উত্তর শুরুতেই জানা থাকে না। কখনো একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা, একটি সুযোগ কিংবা আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ কোনো অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
তাই কোনো ব্যর্থতাকেই জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি ভেবে বসো না। কখনো থেমে নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর শোনো। তুমি সত্যিই কী করতে চাও, কোন কাজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাও—সেটি বোঝার চেষ্টা করো।
আশা করি, তুমি নিজের জীবনটাই যাপন করবে। কারণ, তোমার নিজের জীবনটি তোমার কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।