
ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং আপাতত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নেতানিয়াহু।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) পর্যন্ত প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোট গণনার ভিত্তিতে দেশটির তিনটি প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমের পূর্বাভাসে বলা হয়, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী, কট্টর ডানপন্থী ও অতি-রক্ষণশীল ধর্মীয় দলগুলোর জোট ১২০ আসনের সংসদে ৫৩টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৪৮টি আসন। আর আরব ইসরায়েলিদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সম্ভাব্য আসন ১৯টি। খবর রয়টার্সের।
ইসরায়েলের সংসদে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। প্রাথমিক ফলাফলে কোনো জোটই সেই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি। ফলে নতুন সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের জোটের জন্য আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ইসরায়েলের অনেক ইহুদি রাজনৈতিক নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের বিরোধিতা করেন। এতে সরকার গঠনের আলোচনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ভোট গণনা পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় চূড়ান্ত ফলাফলে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গিয়েছিল, প্রাথমিক ফলাফলে বিরোধীরা সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সমঝোতা ব্যর্থ হলে আগামী বছর নতুন নির্বাচন পর্যন্তও তাঁকে এ দায়িত্বে থাকতে হতে পারে।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষক গাই লুরি বলেন, আইন অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা নিয়মিত সরকারের মতোই। তবে এ ধরনের সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংযত থাকতে হয় এবং কিছু বিষয়ে তাদের স্বাধীনতা সীমিত থাকে।
এর অর্থ, নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চললেও ইরানের সঙ্গে সংঘাতসহ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে থাকতে পারে।
বুধবার গভীর রাতে নিজের দল লিকুদের সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। তিনি ইসরায়েলে একটি শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দেন।
নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের হুমকি চিরতরে দূর করতে দুই দেশের সামনে ইতিহাসের একটি বিশেষ সুযোগ এসেছে।
এর আগে ট্রাম্পও ইসরায়েলি ভোটারদের নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এতে দুই নেতা মিলে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ করতে পারবেন। নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প নেতানিয়াহুর পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন এবং দাবি করেন, তাঁর সমর্থনও এই ফল পেতে ভূমিকা রেখেছে।
বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট স্বীকার করেছেন, নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তাঁর আশঙ্কা, নেতানিয়াহু রাজনৈতিক সুবিধা নিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ব্যবহার করতে পারেন।
আইজেনকট নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মচারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষ্য, নেতানিয়াহুর হাতে জনগণের নতুন কোনো ম্যান্ডেট নেই। তাই সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কাজে হস্তক্ষেপের চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করা উচিত।
এর আগে নেতানিয়াহুর কার্যালয় অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিল, তিনি রাজনৈতিক সুবিধা নিতে ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে ব্যবহার করছেন না। বুধবার এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাঁর কার্যালয় তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া এবং নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব ইসরায়েলের আর্থিক বাজারেও দেখা গেছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রা শেকেলের দাম প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রতি ডলারে ৩ দশমিক ১০ শেকেলে দাঁড়ায়। তেল আবিবের প্রধান শেয়ারবাজার সূচকগুলোও ৩ শতাংশের বেশি কমেছে।
বাজারের এই প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।
নির্বাচনের প্রাথমিক ফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইসরায়েলের ইহুদি ভোটারদের মধ্যে ডানপন্থী রাজনীতির সমর্থন শক্তিশালী রয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রথম দিকে মধ্য-বামপন্থী দলগুলোর প্রভাব বেশি থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেসব দলের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
বর্তমানে ইসরায়েলের অধিকাংশ ইহুদি রাজনৈতিক দল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে। অথচ ১৯৯০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন যোদ্ধাদের হামলার পর এটিই ছিল ইসরায়েলের প্রথম নির্বাচন। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর ইসরায়েল গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে উপত্যকাটির বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তিনি অভিযোগগুলোকে অযৌক্তিক বলে দাবি করেছেন। এ ছাড়া ইসরায়েলেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা রয়েছে। নেতানিয়াহু এসব অভিযোগকে প্রভাবশালী মহলের ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিদের মধ্যেও ভোট দেওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি এই জনগোষ্ঠীর মানুষ।
নেতানিয়াহু সরকারের নীতির প্রতিবাদ জানাতে অনেক আরব ভোটার ভোট দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, সরকারের কয়েকজন নেতা আরবদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মনোভাব প্রকাশ করেছেন। নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক রাজনীতিক অতীতে আরবদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।
আরব দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্টের কার্যালয়ে বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর সমর্থকেরা উল্লাস করেন। জোটটির প্রার্থী ফাতেন গাত্তাস বলেন, ‘আমরা দখলদারত্ব ও বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করি। আমরা এখানেই থাকব।’
এর আগে একটি ছোট আরব দলের সমর্থন নিয়ে গঠিত জোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পেরেছিল। এবার আইজেনকটের জোট প্রত্যাশার চেয়ে কম আসন পাওয়ায় সরকার গঠনের আলোচনায় জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির অধিকাংশ ইহুদি রাজনৈতিক নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠন এড়িয়ে চলেছেন। ফলে নতুন সরকার গঠনের সমীকরণ আরও জটিল হতে পারে।