
আখরোট ও কাজুবাদাম—দুটিই পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। উভয় বাদামেই রয়েছে অসম্পৃক্ত চর্বি, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। তবে পুষ্টি উপাদানের ধরন ও পরিমাণে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
আখরোটে রয়েছে উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা মস্তিষ্ক ও হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, কাজুবাদামে রয়েছে প্রোটিনের পাশাপাশি কপার, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন ও জিঙ্কের মতো খনিজ উপাদান। তাই কোনটি বেশি উপকারী, তা নির্ভর করে আপনার পুষ্টির চাহিদা ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
আখরোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান হলো আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড (এএলএ)। এটি একধরনের উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। প্রতি এক আউন্স বা প্রায় ২৮ গ্রাম আখরোটে প্রায় ২ দশমিক ৫৭ গ্রাম এএলএ পাওয়া যায়।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও কোষের গঠন বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। কিছু গবেষণায় নিয়মিত আখরোট খাওয়ার সঙ্গে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাভাবনার দক্ষতা ভালো থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকির সঙ্গেও এর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে আখরোট খেলেই স্মৃতিশক্তি বাড়বে বা মস্তিষ্কের ক্ষয় রোধ হবে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
এ ছাড়া আখরোটে রয়েছে বিভিন্ন অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এগুলো শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হলো শরীরে ক্ষতিকর মুক্ত মৌল ও সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার অবস্থা। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে কোষ, প্রোটিন ও ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আখরোট ও কাজুবাদাম—দুটিতেই অসম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে। খাদ্যতালিকায় স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে এ ধরনের স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ করলে হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকার হতে পারে।
আখরোটে পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। অন্যদিকে, কাজুবাদামে রয়েছে মনো-আনস্যাচুরেটেড ও পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান।
কিছু গবেষণায় কাজুবাদাম খাওয়ার সঙ্গে রক্তচাপ ও রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে এর প্রভাব সবার ক্ষেত্রে একই হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে শুধু একটি নির্দিষ্ট বাদামের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
একই পরিমাণ আখরোট ও কাজুবাদামের তুলনায় কাজুবাদামে সাধারণত ক্যালরি ও মোট চর্বি কিছুটা কম এবং প্রোটিন সামান্য বেশি থাকে। প্রোটিন পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। তাই ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় পরিমিত পরিমাণে কাজুবাদাম রাখা যেতে পারে।
তবে কাজুবাদাম খেলেই ওজন কমবে, এমন নয়। আখরোট ও কাজুবাদাম—দুটিতেই ক্যালরি রয়েছে। অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে দৈনিক ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাদামের ধরন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ খাওয়ার পরিমাণ।
কাজুবাদাম কপার, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন ও জিঙ্কের ভালো উৎস। এসব খনিজ শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
কপার: শরীরে শক্তি উৎপাদন, স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম ও আয়রন ব্যবহারে সহায়তা করে।
ম্যাগনেশিয়াম: পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আয়রন: রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
জিঙ্ক: রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ও ক্ষত নিরাময়ের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।
মস্তিষ্ক ও হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পেতে চাইলে আখরোট ভালো বিকল্প। অন্যদিকে, প্রোটিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদানের জন্য কাজুবাদাম খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।
তবে একটিকে অন্যটির বিকল্প হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। সুষম খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে দুই ধরনের বাদামই রাখা সম্ভব।
স্বাস্থ্যকর বাদাম বেছে নেওয়ার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।
অতিরিক্ত লবণ বা চিনি মেশানো বাদামের পরিবর্তে লবণবিহীন বাদাম বেছে নিন।
একবারে বেশি না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে খান।
বাদামকে নিয়মিত সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে রাখুন।
বাদামে অ্যালার্জি থাকলে সংশ্লিষ্ট বাদাম এড়িয়ে চলুন।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, শুধু আখরোট বা কাজুবাদাম খেলেই হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না। সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।