
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো গোপন সমঝোতা হচ্ছে কি না, তা জাতির সামনে স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, দেশে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব দরজায় কড়া নাড়ছে। সেই বিপ্লবের জন্য দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ঢাকা থেকে খুলনা বিভাগ অভিমুখী ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, দুই দিন আগে চার দিনের সফর শেষে তিনি দেশে ফিরেছেন। কী উদ্দেশ্যে ওই সফর ছিল এবং সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, তা জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো লুকোচুরি হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘কানেকটিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারও কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না।’
বক্তব্যে অতীতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, যারা দাসত্ব স্বীকার করেছিল, তাদের পরিণতি এখন ভোগ করতে হচ্ছে। তাঁদের ‘দিদি-দাদা’ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে পার পাওয়া যাবে না।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে লংমার্চের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, বিরোধী দল সাত দফা দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করছে। এর মধ্যে প্রধান দাবি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। তাঁর ভাষ্য, এই দাবি বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণেই বাকি ছয় দফা সামনে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হলে চাঁদাবাজ, দখলদার, দুর্নীতিবাজ ও মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য কমানোর পথ তৈরি হতো।
বিএনপির সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, দলটি জাতিকে হতাশ করেছে এবং জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচার ও জনগণের রায়কে উপহাস করার অভিযোগও তোলেন তিনি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে বিএনপিকে উচ্চমূল্য দিতে হবে বলে আগে সতর্ক করেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, দলটি সম্ভবত সেই পরিণতির দিকেই এগোচ্ছে।
আগামী ৯ নভেম্বর সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।
সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ অভিযোগ করেন, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসহ বিভিন্ন সরকারি কার্যালয় বিএনপির কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। এসব জায়গা থেকে সরকারি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের জমি দখল করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে অলি আহমদ বলেন, দিন শেষে এসব কর্মকাণ্ডের দায় তাঁর ওপরই বর্তাবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সংবিধান সংস্কার না করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করাই দেশের বিভিন্ন সংকটের মূল কারণ। তাঁর অভিযোগ, সরকার বিভিন্নভাবে জনগণের রায়কে অসম্মান করছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার সাংবিধানিক পদগুলোতে দলীয় লোক নিয়োগ দিতে চায়। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হলে তা সম্ভব হবে না—এমন বিবেচনা থেকেই সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের লংমার্চের মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলা হচ্ছে। জনগণ সরকারকে ‘লাল কার্ড’ দেখাবে এবং প্রতারণা মেনে নেবে না।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধানসহ ১১-দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
তবে উদ্বোধনী সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন কিংবা দলটির অন্য কোনো নেতাকে দেখা যায়নি।
শফিকুর রহমানের বক্তব্য শেষে সকাল সাড়ে আটটার দিকে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে লংমার্চের গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। প্রায় ৪২৫ কিলোমিটারের এ যাত্রায় ১৯টি জেলা অতিক্রম করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা থেকে হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক ধরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, খুলনা, রূপসা সেতু পার হয়ে যশোর ও কুষ্টিয়ার দিকে যাবে গাড়িবহর।
পথে নাওডোবা, বাগেরহাটের কাটাখালী, খুলনার বাবরী চত্বর ও স্বাধীনতা চত্বর, যশোরের মুড়লি মোড় এবং ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। লংমার্চের শেষ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিকে সামনে রেখে এ লংমার্চ করছে ১১-দলীয় ঐক্য। তাদের অন্য দাবিগুলো হলো—
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি।
দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ।
প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ।
এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছিল ১১-দলীয় ঐক্য। খুলনা বিভাগের কর্মসূচির পর আগামী ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে আরেকটি লংমার্চ করার ঘোষণা দিয়েছে জোটটি।