
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়াকে ফল বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন না জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তাঁর মতে, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে খাতা মূল্যায়ন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার সাময়িক প্রভাব পড়েছে ফলাফলে। তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা আরও যত্নবান হলে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে পাসের হার বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
শনিবার (১ নভেম্বর) এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ফলাফল বিশ্লেষণ ও করণীয় বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
পাসের হার কমে যাওয়া প্রসঙ্গে ড. আমানুল্লাহ বলেন, এবারের ফলাফলকে তিনি বিপর্যয় মনে করেন না; বরং স্বাভাবিক ফলাফল হিসেবে দেখছেন।
তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের যেভাবে শেখানো, দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা প্রয়োজন ছিল, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হয়তো তা করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য শিক্ষার্থীদের দোষারোপ না করে নিজেদের সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলের উদাহরণ তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পাস কোর্স ও প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স পরীক্ষায় পাসের হার অর্ধেকের নিচে নেমেছে। অনার্স পরীক্ষায়ও পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে রয়েছে।
তিনি বলেন, খাতা মূল্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া, পুনর্মূল্যায়ন এবং শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনার কারণে ফলাফলে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার মান বাড়ানোর অংশ হিসেবে মূল্যায়নব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও পরীক্ষার প্রস্তুতি ও খাতা মূল্যায়নে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যে এ পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অধ্যাপক আমানুল্লাহ। তিনি বলেন, অনেক উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের পুরো এক বছর অপেক্ষা করতে হয় না।
এ বছর শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বাংলাদেশেও এ ধরনের সুযোগ চালু করেছেন উল্লেখ করে তাঁকে ধন্যবাদ জানান উপাচার্য। তাঁর আশা, বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ ও খাতা পুনর্মূল্যায়নের ফলে আরও অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারবেন। এসব প্রক্রিয়া শেষে পাসের হার প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফলাফলে হতাশ না হয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
তিনি বলেন, যেসব কলেজের শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হয়েছেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে বসে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করা এবং সমাধানের পথ বের করা। কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করা যাবে না; বরং তাঁদের সাহস ও আত্মবিশ্বাস জোগাতে হবে।
প্রয়োজনে নিয়মিত ক্লাসের বাইরেও শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। বিশেষ করে যেসব বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন, সেসব বিষয়ে বাড়তি সময় দিয়ে পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দেন উপাচার্য।
ড. আমানুল্লাহ বলেন, শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো বিবেচনা করে শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত সম্মানী ছাড়াই বাড়তি পাঠদানের মাধ্যমে তাঁদের সহযোগিতা করা উচিত।
তাঁর মতে, আগামী এক-দুই মাস শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আন্তরিকভাবে কাজ করলে অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারবেন। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হতাশ হওয়ার কিছু নেই। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আবার বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উপাচার্যের মতে, পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে পাসের হার বাড়বে। এবারের ফলাফল থেকে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছেন, উত্তীর্ণ হতে হলে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষকদেরও বুঝতে হবে তাঁদের দায়িত্ব কী এবং খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের প্রচেষ্টা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ এবং মূল্যায়নব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আসছে।
এই সংস্কারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাময়িকভাবে পাসের হার কমলেও ভবিষ্যতে এসএসসি, এইচএসসি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় পাসের হার বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন অধ্যাপক আমানুল্লাহ।