
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। যৌথ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং সরঞ্জাম উৎপাদনে সহযোগিতা জোরদার করতে দুই দেশের জন্য পাঁচটি অগ্রাধিকার নির্ধারণের সুপারিশ করেছে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, চীনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তা ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বিকাশ শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে। ওই বছর অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ডের ভারত সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। ২০০৬ সালে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে কোয়াড সংলাপ এবং মালাবার নৌমহড়ায় অংশ নেয় দুই দেশ।
চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সহযোগিতাও গভীর হয়েছে।
২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর চীনকে নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়ে। একই সময়ে চীনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যিক বিরোধ এবং বেইজিংয়ের আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ ক্যানবেরার নিরাপত্তা ভাবনায় প্রভাব ফেলে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে দুই দেশ ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ প্রতিষ্ঠা করে। একই বছর সামুদ্রিক ও সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা, পারস্পরিক রসদ সহায়তা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালু হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বাহিনী ১৪টি দ্বিপক্ষীয় এবং ৬৪টি ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে।
এসব মহড়ায় সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ, আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন মোকাবিলা, সমুদ্রে জ্বালানি ও রসদ সরবরাহ এবং বহুমাত্রিক সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। দুই দেশের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থার অসামঞ্জস্য, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণনীতি এবং সামরিক সদস্যদের দ্রুত ভিসা পাওয়ার সুবিধার অভাব যৌথ কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে।
এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে প্রতিবেদনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হলো—
১. প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সেবা সরবরাহসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক দ্রুত চূড়ান্ত করা।
২. দুই দেশের মধ্যে নিরাপদ সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৩. উভয় দেশের দ্বীপাঞ্চলে পি-৮ নজরদারি উড়োজাহাজের পারস্পরিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
৪. উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি বিধিনিষেধ শিথিলের উদ্যোগ নেওয়া।
৫. যৌথভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন শুরু করা।
প্রতিবেদনে যৌথ উৎপাদনের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা, সাবমেরিন শনাক্তকরণে ব্যবহৃত সোনোবয়, সাঁজোয়া যান, চালকবিহীন ডুবোযান এবং প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ভারত মহাসাগরের দুই প্রান্তে অবস্থিত ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামরিক সক্ষমতা পরস্পরের পরিপূরক। দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নজরদারি ও নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হবে।