
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতনে বিশ্বের শীর্ষ ১০ বিলিয়নিয়ারের সম্মিলিত সম্পদ এক মাসে কমেছে ২৭ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে সম্পদ কমলেও বিশ্বের শীর্ষ ধনীর অবস্থান ধরে রেখেছেন টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ফোর্বসের ১ নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনীর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলার। আগের মাসের তুলনায় এই পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
সম্পদ কমলেও বিশ্বের ধনীদের তালিকায় প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছেন ইলন মাস্ক। ১ নভেম্বর তাঁর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এক মাসে তাঁর সম্পদ কমেছে ৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
মাস্কের সম্পদের বড় অংশ এসেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলা ও মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স থেকে। স্পেসএক্সের চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা তিনি। প্রতিষ্ঠানটির ৩৮ শতাংশ শেয়ারের মালিকও মাস্ক। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্পেসএক্স তাঁর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সএআই অধিগ্রহণ করে।
এ ছাড়া টেসলার প্রায় ১১ শতাংশ শেয়ারের মালিক তিনি। ফোর্বসের হিসাবে, এক মাসে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম ১১ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে টেসলার শেয়ারের দাম বেড়েছে ১৩ শতাংশ। তবে টেসলার শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি স্পেসএক্সের দরপতনের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারেনি।
বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী অবস্থানে রয়েছেন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। তাঁর সম্পদের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ১০০ কোটি ডলারে। এক মাসে তাঁর সম্পদ কমেছে ৮০০ কোটি ডলার। মূলত অ্যামাজনের শেয়ারের দাম ৪ শতাংশ কমে যাওয়ায় তাঁর সম্পদে এই প্রভাব পড়েছে।
শীর্ষ ধনীদের তালিকায় প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের আধিপত্য স্পষ্ট। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ। এক মাসে তাঁর সম্পদ কমেছে ৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। ফলে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
চতুর্থ স্থানে রয়েছেন ডেল টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ডেল। এক মাসে তাঁর সম্পদ কমেছে ৪ হাজার কোটি ডলার। বর্তমানে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ২২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। মাত্র ১৯ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের ছাত্রাবাসে কম্পিউটার বিক্রির ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি।
পঞ্চম অবস্থানে রয়েছেন গুগলের আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ২১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এক মাসে তাঁর সম্পদ কমেছে ৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির উন্নয়নেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।
ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছেন ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা ও মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। এক মাসে তাঁর সম্পদ কমেছে ৪ হাজার কোটি ডলার। বর্তমানে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ২১ হাজার ১০০ কোটি ডলার। ২০০৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালে ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বর্তমানে মেটার অধীনে ফেসবুক ছাড়াও ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ রয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় সপ্তম স্থানে রয়েছেন এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং। তাঁর সম্পদের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে।
এনভিডিয়ার তৈরি গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরিতে এসব চিপের চাহিদা বেড়েছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা ও বাজারমূল্য দ্রুত বেড়েছে।
অষ্টম স্থানে রয়েছেন ওরাকলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৭ হাজার ২০০ কোটি ডলার।
নবম অবস্থানে রয়েছেন মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী স্টিভ বালমার। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার। এই দুজনের সম্পদের বড় উৎস প্রযুক্তি খাতের ব্যবসা ও শেয়ারের মালিকানা।
শীর্ষ ১০ ধনীর মধ্যে স্টিভ বালমার ও ওয়ারেন বাফেটের সম্পদ গত মাসে কমেনি; বরং বেড়েছে।
দশম অবস্থানে থাকা বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের সম্পদের পরিমাণ ১৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এক মাসে তাঁর সম্পদ বেড়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে, বালমারের সম্পদ বেড়েছে ১০০ কোটি ডলার।
বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর গত ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে অবসর নেন বাফেট।
ফোর্বসের তালিকার উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনীর সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং সবাই পুরুষ। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের সম্পদের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি ডলারের বেশি। তালিকার দশম ব্যক্তি ওয়ারেন বাফেটের সম্পদও ১৫ হাজার কোটি ডলারের ওপরে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী নারী ওয়ালমার্টের প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ওয়ালটনের মেয়ে অ্যালিস ওয়ালটন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। বিশ্বের ধনীদের তালিকায় তাঁর অবস্থান ১৪তম। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ওয়ালমার্টের মালিকানাই তাঁর সম্পদের প্রধান উৎস।
ফোর্বস ১৯৮৭ সাল থেকে বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করে আসছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের দাম ও বিনিময় হারের পরিবর্তনের ভিত্তিতে সাময়িকীটি নিয়মিত এই হিসাব হালনাগাদ করে।