
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্তের রায় কার্যকরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্তের রায় বাস্তবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য মামলায় যেসব আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেসব রায়ও পর্যায়ক্রমে কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শেখ হাসিনার সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ পলাতক আসামি শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই রায়ে তাঁর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার ও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। দ্রুত শেখ হাসিনার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া না হলে সেগুলো বিক্রি, ভোগ বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তরের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ অবস্থায় শেখ হাসিনার সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে সেগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অনুযায়ী, বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিতরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই মামলায় রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। প্রতিবেদনে উল্লেখিত সাত আসামিই পলাতক রয়েছেন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই মামলার রায়ে ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন।
ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অনুযায়ী, বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একই মামলায় অন্য তিন আসামি কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে চার আসামির স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রির অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশও দেন ট্রাইব্যুনাল।