
ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে সহায়তার জন্য সামরিক পরিবহন বিমান পাঠিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব দাবানলে বিস্তীর্ণ বনভূমি পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়া ও কুয়াশা আশপাশের দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। এতে জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দুই দেশের সরকার।
কয়েক মাস ধরে চলা দাবানলে ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে। আগুন থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসতন্ত্রসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিষাক্ত ধোঁয়া সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ায় আঞ্চলিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রধান জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাজধানী জাকার্তা থেকে সি-১৩০ হারকিউলিস মডেলের একটি সামরিক পরিবহন বিমান পূর্ব কালিমান্তান প্রদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। স্থানীয়ভাবে পানি ছিটিয়ে দাবানল নিয়ন্ত্রণের অভিযানে অংশ নেবে বিমানটি।
বৃহস্পতিবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটির প্রধান ক্রিস্টোমেই সিয়ান্তুরি বলেন, পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার কারিগরি দলের সঙ্গে আলোচনার পর দেখা গেছে, পূর্ব কালিমান্তান অঞ্চলের অনেক জায়গায় এখনো আগুন জ্বলছে। ফলে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।
ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থিত অস্ট্রেলীয় দূতাবাসের বিবৃতি অনুযায়ী, সি-১৩০ বিমানটি প্রতিবার উড্ডয়নে প্রায় ১৫ হাজার লিটার পানি ছিটাতে সক্ষম। দিনে একাধিকবার অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বিমানটি এক লাখ লিটারেরও বেশি পানি ফেলতে পারবে।
ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত রড ব্রেজিয়ার বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিনের বন্ধুপ্রতিম দেশ। দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার কথা তুলে ধরে তিনি ২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানল মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়ার সহায়তার বিষয়টিও স্মরণ করেন।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়া একটি সেসনা সাইটেশন উড়োজাহাজও পাঠাচ্ছে। এটি মূল অগ্নিনির্বাপণ বিমানকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও পথ দেখানোর কাজ করবে। এ ছাড়া পাইলট, উড়োজাহাজের কর্মী ও প্যারামেডিকসহ মোট ২০ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দলও অভিযানে অংশ নেবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৬ থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত সাত দিন ধরে চলবে এই বিমান অভিযান। এ সময় দাবানলে আক্রান্ত এলাকায় পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হবে।
এদিকে বন উজাড়ের ওপর নজরদারিকারী সংস্থা নুসান্তারা অ্যাটলাসের হিসাব বলছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি জমি পুড়ে গেছে। বনভূমির এত বড় অংশ ধ্বংস হওয়ায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জমি পরিষ্কারের জন্য গাছপালা কেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতি দাবানল ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। কাঠ, পাম অয়েল উৎপাদন এবং খনি ব্যবসার সম্প্রসারণের সঙ্গেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে আগুন ব্যবহারের ফলে অনেক সময় তা আশপাশের বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ দাবানলের সৃষ্টি করে।
দাবানলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুধবার জানিয়েছে, ধোঁয়ার কারণে সৃষ্ট শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় চার লাখের বেশি মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে পশ্চিম কালিমান্তান অঞ্চলে দাবানল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে জাপানও ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৩৫০ জন সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের সদস্য এবং তিনটি হেলিকপ্টার পাঠিয়েছিল। সব মিলিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।