
দীর্ঘ ১০ মাসের বিরতি শেষে আবারও শুরু হয়েছে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল। নতুন মৌসুমে পর্যটকদের দ্বীপে যাতায়াত শুরু হলেও প্রথম দিনেই জাহাজের টিকিটের মূল্য নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সরকার নির্ধারিত কিলোমিটারপ্রতি ভাড়ার হিসাবের তুলনায় সাত গুণেরও বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন পর্যটকেরা। পাশাপাশি জাহাজের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী পরিবহনের ঘটনাও সামনে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাট থেকে ৮৮৬ জন পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করে ‘এমভি বার আউলিয়া’। তবে জাহাজটির নির্ধারিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ৮৫০ জন। পর্যটকদের পাশাপাশি সাংবাদিক, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ আরও প্রায় ৫০ জন যাত্রী থাকায় নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত মানুষ পরিবহনের অভিযোগ উঠেছে।
চলতি মৌসুমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটককে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের অনুমতি দিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন প্রাথমিকভাবে তিনটি জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেয়। ট্যুরিজম বোর্ডের ট্রাভেল পাস ও জাহাজ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিন ভ্রমণের জন্য ৮৮৬ জন পর্যটক টিকিট সংগ্রহ করেন। যাত্রীসংখ্যা কম থাকায় শেষ মুহূর্তে ‘এমভি কর্ণফুলী’র যাত্রা বাতিল করা হয়। পরে ওই জাহাজের যাত্রীদেরও ‘এমভি বার আউলিয়া’য় স্থানান্তর করা হয়। এতে জাহাজটির মোট যাত্রীসংখ্যা নির্ধারিত ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়।
এ ঘটনায় যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্ধারিত ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী নিয়ে কীভাবে জাহাজটি যাত্রা করল এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা তদারককারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে প্রথম দিনের যাত্রায় পর্যটকদের সবচেয়ে বড় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে টিকিটের দাম নিয়ে। তাদের অভিযোগ, কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব প্রায় ৯৫ কিলোমিটার। বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত কিলোমিটারপ্রতি ৩ টাকা ১৭ পয়সা ভাড়া ধরে হিসাব করলে যাতায়াতের ভাড়া দাঁড়ায় প্রায় ৩০১ টাকা। অথচ ‘এমভি বার আউলিয়া’য় সর্বনিম্ন টিকিটের দাম রাখা হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকা।
পর্যটকদের দাবি, কিলোমিটারপ্রতি উল্লিখিত ভাড়ার হিসাবে বর্তমান টিকিটের মূল্য সাত গুণেরও বেশি। যদিও পর্যটনবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে এই ভাড়া সরাসরি প্রযোজ্য কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে স্পষ্টতা নেই। তারপরও টিকিটের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি এবং বিভিন্ন খাতে আদায় করা অর্থের হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাতিয়ার বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, হাতিয়া রুটে এই জাহাজের ভাড়া ছিল ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। অথচ বর্তমানে দূরত্ব কম হওয়া সত্ত্বেও ২ হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এই ভাড়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।
গ্রুপ ট্যুরে আসা নওরীন নেওয়াজের অভিযোগ, সেন্টমার্টিনকে পর্যটন জোন হিসেবে বিবেচনা করে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে সেই অর্থ দ্বীপের উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত। পাশাপাশি কোন খাতে কত টাকা খরচ হচ্ছে, তার হিসাবও জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
কুয়াকাটার বাসিন্দা খালেদ হোসাইন বলেন, ঢাকা থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত ২৫২ কিলোমিটার নৌপথে দেশের বিলাসবহুল জাহাজ চলাচল করে। কিন্তু সেখানেও এত বেশি ভাড়া নেওয়া হয় না। পর্যটন বিকাশের নামে পর্যটকদের ওপর অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ তৈরি করা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি।
ভাড়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে আলোচনায় এসেছে ‘এমভি বার আউলিয়া’র পূর্ববর্তী পরিচালনব্যবস্থাও। ২০২২ সালে চীন থেকে জাহাজটি আমদানি করে সরকার। প্রথম দিকে এটি চট্টগ্রাম-হাতিয়া রুটে চলাচল করত। প্রায় ১৪৫ কিলোমিটারের ওই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগত সাড়ে ছয় ঘণ্টা। সে সময় নন-এসি শোভন চেয়ারের সর্বোচ্চ ভাড়া ছিল ৬৫০ টাকা।
পরবর্তী সময়ে জাহাজটি ‘কর্ণফুলী ক্রুজ লাইন’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি জাহাজটির আধুনিকায়ন করে সেন্টমার্টিন রুটে পরিচালনা শুরু করে। বর্তমানে আগের রুটের তুলনায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার কম দূরত্বে চলাচল করলেও সর্বনিম্ন টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকা। জাহাজের আধুনিকায়ন ও পরিচালনব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি থাকলেও ভাড়ার এত বড় পার্থক্যের ব্যাখ্যা জানতে চাইছেন পর্যটকেরা।
অন্যদিকে জাহাজমালিকদের দাবি, টিকিটের মূল্য শুধু জাহাজের ভাড়া দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এর সঙ্গে পরিবেশ ফি, ঘাটের ইজারা, ট্যুর অপারেটরদের ১০ শতাংশ কমিশন, সেবা চার্জ, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির অর্থ এবং জ্বালানি ব্যয়সহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত রয়েছে।
সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকবাহী জাহাজমালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইনুল ইসলাম বাহাদুর বলেন, টিকিটের দামের মধ্যে জাহাজ ভাড়ার পাশাপাশি পরিবেশ ফি, ঘাটের ইজারা, ট্যুর অপারেটরদের কমিশন, সেবা চার্জ, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির অর্থ এবং জ্বালানি খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
তবে টিকিটে এসব খাতের ব্যয় আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকায় পর্যটকেরা কোন খাতে কত টাকা দিচ্ছেন, তা জানতে পারছেন না। অনলাইনে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে টিকিট ও ট্রাভেল পাস সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকলেও ভাড়ার বিভিন্ন উপাদান প্রকাশ না করায় আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
পরিবেশ ফি আদায়ের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পরিবেশ ফি বাতিল করা হয়েছে। ফলে জাহাজমালিকেরা কোন ভিত্তিতে পরিবেশ ফি আদায় করছেন, তা তাঁর জানা নেই। অন্যদিকে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি জানিয়েছে, তারা জনপ্রতি ২০ টাকা করে আদায় করে।
বিআইডব্লিউটিএর চট্টগ্রাম দপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নয়ন শীল বলেন, সুন্দরবনের মতো সেন্টমার্টিন রুটেও তারা ভাড়া নির্ধারণ করেননি। তবে পর্যটকদের অভিযোগের পর এখন ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হবে।
বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মো. আলমগীর কবীর জানান, সংস্থাটি সাধারণত লঞ্চের ভাড়া নির্ধারণ করে, পর্যটন জোনের ভাড়া নয়। তবে ঢাকা-পটুয়াখালী রুটের তুলনায় সেন্টমার্টিন রুটে ভাড়া অনেক বেশি। এ ধরনের উচ্চ ভাড়া পর্যটনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও জানান, আগামী ৯ নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও জাহাজমালিকদের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। সভায় জাহাজের ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি চূড়ান্ত করার পাশাপাশি টিকিটে কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, তা পৃথকভাবে উল্লেখ করার বিষয়েও আলোচনা হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘাটের রাজস্ব বাবদ বিআইডব্লিউটিএ জনপ্রতি ৫০ টাকা আদায় করে, যা টিকিটের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
এদিকে ভাড়া ও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন নিয়ে বিতর্ক চললেও প্রায় পাঁচ ঘণ্টার সমুদ্রযাত্রা শেষে বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া একটার দিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছায় ‘এমভি বার আউলিয়া’। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকবাহী জাহাজ দ্বীপে পৌঁছানোর খবরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। দ্বীপে পৌঁছানো পর্যটকদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানান স্থানীয়রা।
দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের আগমনে দ্বীপের পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে আসে। তবে যাত্রাপথে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে অসন্তোষের কারণে পর্যটকদের আনন্দ কিছুটা ম্লান হয়।
প্রথমবার সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসা ঢাকার যাত্রাবাড়ীর পর্যটক ইসরাত জাহান বলেন, জাহাজ থেকে নীল সমুদ্রের পানি দেখে তাঁর মন ভরে গেছে। দ্বীপে পৌঁছানোর পরের অনুভূতিও ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
পর্যটকদের দ্বীপে নামিয়ে দিয়ে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে উদ্বোধনী যাত্রার সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে ফিরে আসে জাহাজটি। প্রথম দিন কোনো পর্যটক কক্সবাজারে ফেরেননি। মোট ৮৮৬ জন পর্যটকই দ্বীপে রাত যাপন করছেন। শুক্রবার বিকেলে একই জাহাজে তাঁদের ফিরে আসার কথা রয়েছে।
দীর্ঘ ১০ মাস পর সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় দ্বীপের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে নতুন করে প্রাণ ফেরার আশা তৈরি হয়েছে। তবে প্রথম দিনেই টিকিটের উচ্চমূল্য, ভাড়ার বিভিন্ন খাতের হিসাব নিয়ে অস্পষ্টতা এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের অভিযোগ সামনে এসেছে। পর্যটন কার্যক্রম স্বাভাবিক ও টেকসই রাখতে হলে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা জরুরি।