
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় ইয়েমেন নতুন করে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজধানী সানা-র সাধারণ মানুষ এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। শহরের ঘিঞ্জি গলিতে ছোট্ট আইসক্রিমের দোকান চালানো ইয়াসিরের মতো হাজারো মানুষ এই পরিস্থিতিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তার আয়ের একমাত্র উৎস এই দোকান, যা দিয়ে তিনি পাঁচ সদস্যের পরিবার চালান।
ইয়াসির আশঙ্কা করছেন, হুথি বিদ্রোহী-দের সামরিক তৎপরতার কারণে যদি ইসরায়েল পাল্টা হামলা চালায়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং নিরাপত্তাহীনতা একসঙ্গে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে।
গত ২৮ মার্চ হুথি বিদ্রোহীরা ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলে হামলার দাবি করে এবং লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। যদিও এখন পর্যন্ত হামলাগুলো সীমিত এবং অনেকটাই প্রতিহত করা হয়েছে, তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
সানার ট্যাক্সিচালক আম্মার আহমেদের মতো অনেকেই অতীতের হামলার ভয়াবহ স্মৃতি বহন করছেন। তিনি জানান, বিস্ফোরণের শব্দে পুরো শহর কেঁপে ওঠে এবং কোথাও নিরাপত্তা নেই বলে মনে হয়। এমন পরিস্থিতিতে তিনি তার পরিবারকে গ্রামে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, কারণ শহরগুলো হামলার ঝুঁকিতে বেশি।
অন্যদিকে, সানার বাড়ির মালিকরাও এখন ভাড়াটিয়া বাছাইয়ে সতর্ক হচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, যদি কোনো হুথি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাদের বাড়িতে থাকেন, তাহলে ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে পুরো ভবনটি।
গত কয়েক বছরে ইয়েমেনে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইসরায়েলের হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে হুথি নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে খুব কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ইয়েমেনের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হতে পারে। অর্থনৈতিক গবেষক ওয়াসিক সালেহ বলেন, এর ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি একটি ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। এতে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, সমুদ্রপথে উত্তেজনা বাড়লে মৎস্য খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার ওপর প্রায় পাঁচ লাখ ইয়েমেনি নির্ভরশীল। পাশাপাশি হুদাইদাহ বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে সব উদ্বেগের মাঝেও হুথি সমর্থকদের একটি অংশ তাদের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখছে। তারা মনে করে, এই সংঘাত থেকে সরে দাঁড়ানো সম্ভব নয় এবং এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তবতার অংশ। হুথি নেতা আবদেল-মালেক আল-হুথি-ও এক ভাষণে বলেছেন, এই সংঘাত এড়িয়ে যাওয়া ‘বুদ্ধিমানের কাজ নয়’ এবং তাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
সবশেষে, ইয়াসিরের মতো সাধারণ মানুষই এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। প্রতিদিন তারা অনিশ্চয়তা, ভয় এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। চলমান এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইয়েমেন আরও গভীর মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।