
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএর বিভিন্ন অফিসে ঘুষ বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে এবং অভিযোগ উঠেছে যে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সেবাগ্রহীতাদের অনেককেই বছরের পর বছর ঘুরতে হয় এবং এই হয়রানি থেকে বাঁচতে তারা বাধ্য হয়ে দালালদের শরণাপন্ন হন। বিশেষ করে ঢাকার সাভার ও কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া অফিসে দালালচক্রের তৎপরতা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী সাভার বিআরটিএ অফিসে একটি শক্তিশালী দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে, যার নেতৃত্বে আছেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাকসুদা সুলতানা এবং তাঁর ভাই প্লাবন রহমান। তাদের নেতৃত্বে একাধিক দালাল অফিসের ভেতরেই বসে কাজ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরাসরি সেবা নিতে গেলে নানা অজুহাতে গ্রাহকদের ঘোরানো হয়, কিন্তু দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অফিসের আশপাশে ফটোকপি ও কম্পিউটার দোকান ব্যবহার করে দালালরা তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এমনকি অফিসের ভেতরেও বহিরাগতদের চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন সেবা যেমন ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ, গাড়ির নিবন্ধন বা মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা বা নতুন কাগজের অজুহাতে হয়রানি করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার নামেও ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম ভেঙে শিক্ষানবিশ লাইসেন্সধারীদেরও অর্থের বিনিময়ে নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে। এক প্রবাসী জানান, তিনি এক মাসের ছুটিতে দেশে এসে ১৫ দিন ধরে লাইসেন্সের জন্য ঘুরেও কাজ করতে পারেননি। আরেকজন অভিযোগ করেন, জমা দেওয়া কাগজপত্র পর্যন্ত হারিয়ে গেছে এবং তাকে আবার নতুন করে আবেদন করতে বলা হয়েছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, দালালরা ফাইল চিহ্নিত করতে সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে এবং সেই অনুযায়ী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে দ্রুত অনুমোদন নেওয়া হয়। ভুয়া মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও জাল কাগজপত্র তৈরির অভিযোগও রয়েছে। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দালালচক্রের সদস্যরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া বিআরটিএ অফিসেও। সেখানে দালালরা অফিসের বাইরে অবস্থান করে কম্পিউটার দোকানের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে। শিক্ষানবিশ লাইসেন্স নিতে সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে এবং পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার নামে আরও বেশি ঘুষ দাবি করা হচ্ছে। ঘুষ না দিলে ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক সাভার অফিসে অভিযান চালিয়ে দালালদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেয়েছিল। ওই সময় পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়েছিল। তবে অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও বর্তমানে আবার আগের মতো ঘুষ বাণিজ্য শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, অফিসের ভেতরে বহিরাগতদের কাজ করার সুযোগ নেই এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বিআরটিএ অফিসে ঘুষ ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। অনলাইন সেবা চালু থাকলেও তা কার্যকরভাবে কাজে লাগছে না এবং দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।