
দেশে মার্চ মাসে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র উঠে এসেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই মাসে মোট ৫৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩২ জন নিহত এবং ২ হাজার ২২১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৬৬ জন নারী এবং ৯৮ জন শিশু রয়েছে, যা সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। মার্চ মাসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২০৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে ২১৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেপরোয়া গতি, তরুণ চালকদের ঝুঁকিপূর্ণ চালনা এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য যানবাহনেও উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ঘটেছে। থ্রি-হুইলার দুর্ঘটনায় ৯৪ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে ৪৬ জন, বাসে ৪৫ জন, ট্রাক-পিকআপ ও ট্রাক্টরে ২৮ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনে ২৩ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে ২৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ, গ্রামীণ সড়কে ১২ দশমিক ১৫ শতাংশ, শহরের সড়কে ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং অন্যান্য স্থানে ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪০ দশমিক ১০ শতাংশ দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ২৮ দশমিক ৮১ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষে, ১৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দিয়ে এবং ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ যানবাহনের পেছনে আঘাতের কারণে ঘটেছে। এছাড়া ১ দশমিক ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা অন্যান্য কারণে সংঘটিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, মার্চ মাসে মোট ১ হাজার ৮টি যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ২৪৪টি, থ্রি-হুইলার ২০০টি, বাস ১৩৩টি এবং ট্রাক ১২০টি রয়েছে। অন্যান্য যানবাহনও বিভিন্ন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।
সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে (২৩ দশমিক ২৬ শতাংশ) এবং দুপুরে (২২ দশমিক ৯২ শতাংশ)। রাতে ২১ শতাংশ, বিকেলে ১৭ শতাংশ, সন্ধ্যায় ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং ভোরে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১২৬টি দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগেও দুর্ঘটনার হার তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ২৭টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় পৃথকভাবে ৪৬টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষক ১৪ জন, সাংবাদিক ৫ জন, চিকিৎসক ২ জন, আইনজীবী ৩ জন, ব্যাংক ও বীমা কর্মকর্তা ১৭ জন, এনজিও কর্মী ১২ জন, ব্যবসায়ী ২৭ জন, বিক্রয় প্রতিনিধি ২৩ জন, পোশাক শ্রমিক ৯ জন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭৯ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে ১৫ দশমিক ৪২ জন নিহত হলেও মার্চে তা বেড়ে ১৭ দশমিক ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের দুর্বল অবকাঠামো, চালকের অদক্ষতা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তারা মত দিয়েছেন।