
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে চলমান জ্বালানি তেলের সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই পরিস্থিতি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও চাপের মুখে ফেলছে এবং বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারের ওপরে পৌঁছায়। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) প্রায় ৮.৫ শতাংশ বেড়ে ১০৪.৮২ ডলারে ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক সংঘাতের ইঙ্গিত বহন করছে, যা ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য অবরোধ হলে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বের একটি বড় অংশের জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে সরকার বড় ধরনের ভর্তুকির চাপের মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুন পর্যন্ত তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে, যার মধ্যে জ্বালানি খাতে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা লাগবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র জানান, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সরকার নাগরিক স্বস্তি বজায় রাখতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে এবং একই সঙ্গে অবৈধ মজুদ ঠেকাতে অভিযান পরিচালনা করছে।
এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এই কমিটি বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে মন্ত্রিসভায় সুপারিশ দেবে।
গত দেড় মাসে দেশে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি, পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকা এবং “তেল নেই” সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় কম জ্বালানি সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি অবৈধ মজুদ ও কৃত্রিম সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কোথাও কোথাও বেশি দামে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কায় কিছু ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী অতিরিক্ত জ্বালানি মজুদ করছেন, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। বাসাবাড়ি ও গ্যারেজেও জ্বালানি সংরক্ষণের ঘটনা ঘটছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চললেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব শিল্প খাতেও পড়েছে, বিশেষ করে পোশাকসহ বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
জ্বালানি বিতরণে স্বচ্ছতা আনতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) রাজধানীর সাতটি ফিলিং স্টেশনে ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ বাধ্যতামূলক করেছে। এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে জ্বালানি বিতরণ প্রক্রিয়া নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। বর্তমানে তেজগাঁও, আসাদগেট, মহাখালী, শাহবাগ, নিকুঞ্জ, কল্যাণপুরসহ সাতটি স্টেশনে এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে কিছু ব্যবহারকারী নতুন এই ব্যবস্থায় ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন।
সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা, দাম বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার চাপে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি, সঠিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং বাজার নজরদারি এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।