ক্যারিয়ারে পদোন্নতি মানেই বাড়তি বেতন, নতুন দায়িত্ব ও পেশাগত অগ্রগতি। তবে এর সঙ্গে যদি বাড়ে কাজের চাপ, অফিস সময়ের বাইরে ব্যস্ততা এবং ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ, তখন সিদ্ধান্তটা আর সহজ থাকে না।
ভারতের বেঙ্গালুরুর এক সফটওয়্যার ডেভেলপারের সিদ্ধান্ত সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে।
ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে জানায়, ৩১ বছর বয়সী ওই ডেভেলপার বর্তমানে বছরে প্রায় ৪৫ লাখ রুপি আয় করেন। সম্প্রতি তিনি এমন একটি পদোন্নতির প্রস্তাব পান, যা গ্রহণ করলে তার বার্ষিক আয় ৬৫ লাখ রুপির বেশি হতো। অর্থাৎ বছরে প্রায় ২০ লাখ রুপি বাড়তি আয়ের সুযোগ ছিল তার সামনে।
নতুন পদে বড় একটি দল পরিচালনার দায়িত্ব পেতেন তিনি। তার অধীনে থাকা কর্মীর সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতো। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করতে হতো। সপ্তাহে প্রায় চার রাত দেরিতে এসব বৈঠকে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন হতো।
এর সঙ্গে অফিসের কাজে ভ্রমণও বাড়ত। ফলে কর্মঘণ্টা শুধু অফিসের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না। রাতের কল ও বাড়তি দায়িত্বের কারণে ব্যক্তিগত সময়ও কমে যেত।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই শেষ পর্যন্ত পদোন্নতির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন ওই ডেভেলপার। বাড়তি ২০ লাখ রুপির চেয়ে তিনি নিজের সময় ও পারিবারিক জীবনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনও ছিল সিদ্ধান্তের কারণ
ওই ডেভেলপার ও তার স্ত্রী আগামী বছর সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তাই পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়াকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।
পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা করেন তিনি। সপ্তাহে পাঁচ দিন সকালে ব্যায়াম করেন। বাবা-মায়ের সঙ্গেও প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে রাতের খাবার খান। নতুন পদে গেলে এসব অভ্যাস ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তার সিদ্ধান্ত পরিবারের সবার কাছে অবশ্য সহজে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ব্যবসায়িক পরামর্শক রোহান ধাওয়ানের একটি লিঙ্কডইন পোস্ট অনুযায়ী, ওই ডেভেলপারের বাবা প্রশ্ন করেছিলেন—এত বড় বেতন বাড়ানোর সুযোগ পেয়েও কেন তিনি সেটি ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
বেশি বেতনই কি ভালো চাকরির একমাত্র মাপকাঠি?
চাকরিতে ভালো বেতন গুরুত্বপূর্ণ। বাড়তি আয় সঞ্চয় বাড়াতে পারে এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব বেশি থাকলে বেতন বৃদ্ধির সুযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে বেতন বাড়ার সঙ্গে কাজের সময় ও দায়িত্ব কতটা বাড়ছে, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ধরা যাক, একজন কর্মীর বেতন ৩০ শতাংশ বাড়ল। কিন্তু এর বিনিময়ে তাকে সপ্তাহে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। নিয়মিত রাতে অফিসের কল করতে হচ্ছে। ছুটির দিনেও কাজের চাপ থাকছে। সে ক্ষেত্রে বাড়তি আয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের ওপর এর প্রভাবও হিসাব করা জরুরি।
আবার কারও কাছে বাড়তি আয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভবিষ্যতের সঞ্চয়, পরিবারের দায়িত্ব কিংবা নির্দিষ্ট আর্থিক লক্ষ্য পূরণে বেশি বেতন প্রয়োজন হলে একজন কর্মী বাড়তি দায়িত্ব নিতে পারেন।
অর্থাৎ একই চাকরির সুযোগ সবার কাছে সমান আকর্ষণীয় নয়। একজনের কাছে পদোন্নতি ক্যারিয়ারের স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপ। অন্যজনের কাছে সেটি ব্যক্তিগত সময়ের ওপর বাড়তি চাপ।
পদোন্নতির আগে যে বিষয়গুলো ভাবা জরুরি
ক্যারিয়ারে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু বেতনের অঙ্ক দেখা যথেষ্ট নয়। নতুন পদে কাজের সময় কতটা বাড়বে, অফিস সময়ের বাইরে কাজ করতে হবে কি না এবং দায়িত্বের পরিমাণ কতটা বাড়বে—এসব বিষয় জানা জরুরি।
এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনা করা দরকার। পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ থাকবে কি না, নিয়মিত বিশ্রাম ও নিজের পছন্দের কাজের জন্য সময় পাওয়া যাবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন পদটি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে কতটা সুযোগ তৈরি করবে, সেটিও দেখতে হবে। সাময়িকভাবে কাজের চাপ বাড়লেও যদি তা ভবিষ্যতে বড় সুযোগ তৈরি করে, কেউ সেই চাপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
সাফল্যের সংজ্ঞা সবার জন্য এক নয়
কেউ দ্রুত পদোন্নতি, বড় বেতন ও নেতৃত্বের দায়িত্বকে ক্যারিয়ার সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখেন। আবার কেউ পেশাগত উন্নতির পাশাপাশি পরিবার, ব্যক্তিগত সময় ও মানসিক স্বস্তিকেও সমান গুরুত্ব দেন।
প্রযুক্তি খাতে এর ভিন্ন একটি উদাহরণ টনি ইউহুয়াই উ। এক্সএআইয়ের সাবেক এই গবেষক ওপেনএআই ও গুগলের ডিপমাইন্ডে কাজ করেছেন। পরে তিনি এক্সএআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন হন। এআই গবেষণায় তার দ্রুত অগ্রগতি বড় আর্থিক সম্ভাবনারও পথ তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির কাছে প্রায় ৭ কোটি ডলারে একটি বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন। তবে তার পক্ষ থেকে এ তথ্য প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি।
দুটি ঘটনা ক্যারিয়ার সাফল্যের দুটি ভিন্ন দিক তুলে ধরে। কারও কাছে সাফল্য মানে বেশি আয় ও দ্রুত পদোন্নতি। আবার কারও কাছে ভালো আয় করার পাশাপাশি পরিবার ও নিজের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ভালো চাকরির মূল্য শুধু বেতনের অঙ্কে নির্ধারিত হয় না। কাজের পরিবেশ, দায়িত্ব, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে ভারসাম্যও ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।