পবিত্র কোরআনে স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের ‘পোশাক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই পবিত্র বন্ধন আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, শয়তান মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট করে একটি পরিবারে অশান্তি তৈরি করা তার অন্যতম লক্ষ্য।
ছোটখাটো ভুলকে বড় করে দেখানো, অহেতুক সন্দেহ সৃষ্টি, রাগের সময় উসকানি দেওয়া এবং পরস্পরের অধিকার পালনে অবহেলা—এসবের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি তৈরি হতে পারে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।
শয়তানের সবচেয়ে বড় সফলতার একটি হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ বা তালাক ঘটানো। মহানবী (সা.) একটি হাদিসে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘ইবলিস পানির ওপর তার সিংহাসন স্থাপন করে এবং মানুষের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির জন্য তার বাহিনীকে পাঠায়। তাদের মধ্যে একজন এসে বলে, আমি অমুক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে এসেছি। তখন ইবলিস তাকে কাছে টেনে নেয় এবং বলে, তুমিই সবচেয়ে ভালো কাজ করেছ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮১৩)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, পরিবারে বিভেদ সৃষ্টি ও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা শয়তানের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলে তাড়াহুড়া করে বিচ্ছেদের পথে না গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
দাম্পত্য জীবনে স্বামী বা স্ত্রী কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু শয়তান অনেক সময় একজনের ভালো গুণগুলো আড়াল করে অন্যজনের ছোটখাটো ত্রুটিগুলো বড় করে দেখায়। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কমে গিয়ে বিরোধ বাড়তে পারে।
এই বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিন স্বামী যেন তার মুমিন স্ত্রীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করে; কারণ স্ত্রীর একটি স্বভাব অপছন্দ হলেও অন্য একটি স্বভাব তার কাছে পছন্দনীয় হতে পারে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৯)
অর্থাৎ, সঙ্গীর কোনো একটি দিক অপছন্দ হলে তার ভালো গুণগুলোও বিবেচনায় রাখা উচিত। পারস্পরিক সহনশীলতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দাম্পত্য সম্পর্ক সুন্দর রাখতে সাহায্য করে।
দাম্পত্য সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস। কিন্তু শয়তান স্বামী বা স্ত্রীর মনে একে অপরের চরিত্র ও বিশ্বস্ততা নিয়ে অমূলক সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। প্রমাণ ছাড়া সন্দেহ করা, অযথা নজরদারি এবং বারবার অবিশ্বাস প্রকাশ করলে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
পবিত্র কোরআনে জাদুটোনা ও শয়তানি প্ররোচনার ক্ষতিকর দিক বর্ণনা করতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা এমন বিষয় শিখত, যার মাধ্যমে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১০২)
ইমাম ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিদ্বেষ ও বিভেদ তৈরির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। (তাফসির ইবনে কাসির, ১/১৪৪)
তাই দাম্পত্য জীবনে সন্দেহের পরিবর্তে পারস্পরিক বিশ্বাস, খোলামেলা আলোচনা ও সত্য যাচাইয়ের মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মান-অভিমান বা মতবিরোধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে রাগের মুহূর্তে শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ অনেক সময় নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তখন এমন কথা বলে বসে, যা সম্পর্কের গভীর ক্ষতি করতে পারে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, আর শয়তান আগুনের তৈরি।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৪)
রাগের মাথায় তালাকের মতো গুরুতর শব্দ উচ্চারণ করা দাম্পত্য জীবনে বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তাই উত্তেজিত অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজেকে শান্ত করা, আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া এবং পরে ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করা উচিত।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু একসঙ্গে বসবাসের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারস্পরিক দায়িত্ব, ভালোবাসা, মানসিক যত্ন ও শারীরিক অধিকার। শয়তানের প্ররোচনায় কেউ যদি সঙ্গীর ন্যায্য অধিকার পালনে উদাসীন হয়ে পড়ে, তাহলে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া বাইরের গায়রে মাহরাম ব্যক্তির প্রতি অযাচিত আকর্ষণও দাম্পত্য সম্পর্কে অশান্তির কারণ হতে পারে।
এ বিষয়ে মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো ব্যক্তি অন্য নারীর প্রতি আকৃষ্ট হলে সে যেন নিজের স্ত্রীর কাছে ফিরে যায়। এতে তার মনের কুমন্ত্রণা দূর হতে পারে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪০৩)
তাই স্বামী-স্ত্রীর উচিত একে অপরের মানসিক ও শারীরিক প্রয়োজনের প্রতি যত্নশীল থাকা এবং সম্পর্কের বিশ্বস্ততা রক্ষা করা।
শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, ক্ষমা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকা জরুরি। ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া, একে অপরের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা এবং কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা উচিত।
রাগ বা সন্দেহের মুহূর্তে ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় রাখা প্রয়োজন।
দাম্পত্য জীবনের শান্তি বজায় রাখতে শুধু শয়তানের প্ররোচনা থেকে সতর্ক থাকাই যথেষ্ট নয়; স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই নিজেদের দায়িত্ব পালন, ভুল স্বীকার এবং পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
মন্তব্য করুন