ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছর মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন সমঝোতা না হলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শুষ্ক মৌসুমে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে গঙ্গার পানি কীভাবে দুই দেশের মধ্যে বণ্টন হবে, তা এই চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের শুষ্ক বরেন্দ্র অঞ্চলের বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী বিকাশ সরেনের স্মৃতিতে একসময় গঙ্গা বা পদ্মা নদীতে সারা বছর বড় বড় নৌকা চলাচল করত। কিন্তু তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এখন বছরের প্রায় তিন মাস নদীতে পানির প্রবাহ প্রায় থাকেই না।
পানির স্তর কমে যাওয়ায় ধান ও গমের মতো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিকাশ সরেন জানান, গত মৌসুমে ফসল নষ্ট হওয়ার পর দুজন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন।
নদীতে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় জেলেদের জীবনেও পরিবর্তন এসেছে। ৫৫ বছর বয়সী আবু বকর সিদ্দিক এখন নদীতে মাছ ধরার পরিবর্তে পুকুরে মাছ চাষ করছেন। তাঁর ভাষ্য, আগে পদ্মায় নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও এখন সেই সুযোগ অনেক কমে গেছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯৬ সালে। ৩০ বছর মেয়াদি এ চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা।
চুক্তি অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে গঙ্গার পানি দুই দেশের মধ্যে বণ্টনের বিষয়টি নির্ধারিত হয়। ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন সমঝোতা না হলে বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের পানিবণ্টনবিষয়ক টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ পারস্পরিক সুবিধা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে নতুন একটি চুক্তি প্রত্যাশা করে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে গঙ্গা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার ৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা নদীর অববাহিকায় প্রায় ৬৫ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। এর মধ্যে বাংলাদেশের বাসিন্দা ৫ কোটির বেশি।
এ বিশাল জনগোষ্ঠীর কৃষি, পানীয় জল, মৎস্যসম্পদ ও অন্যান্য জীবিকার সঙ্গে নদীটির প্রবাহ সরাসরি সম্পর্কিত।
যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সাবেক সদস্য মালিক ফিদা এ খান অভিযোগ করেছেন, গঙ্গার উজানে ভারত অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ করেছে। তাঁর মতে, নতুন চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি পুরো নদী অববাহিকাকে বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নির্দিষ্ট সময়ের পানিপ্রবাহ নয়, বরং নদীর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ভারসাম্য, শুষ্ক মৌসুমের পানির চাহিদা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও ভবিষ্যৎ চুক্তিতে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন