অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৫ এএম
অনলাইন সংস্করণ

প্রথম জ্বলে উঠেছিল বৈদ্যুতিক বাতি, ইতিহাস ১৯০১ সালের

ঢাকার আকাশে আলোর নতুন অধ্যায়

সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারে ডুবে যেত ঢাকার অধিকাংশ সড়ক। কোথাও কেরোসিনের বাতি, কোথাও দু-একটি গ্যাসের আলো—তাও ছিল অপর্যাপ্ত। ঘরবাড়ি আলোকিত রাখতে মোমবাতি ও কেরোসিনের বাতিই ছিল মানুষের প্রধান ভরসা। এমন এক শহরে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে ওঠা ছিল আধুনিক নগরজীবনের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সময়টা ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর। ঢাকার আহসান মঞ্জিলে জড়ো হয়েছিলেন শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। নবাব আহসানউল্লাহর আমন্ত্রণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কলকাতা থেকে এসেছিলেন রাজস্ব বোর্ডের সচিব সি ডব্লিউ বোল্টনও। বিকেল পাঁচটার দিকে তিনি সুইচ চাপতেই জ্বলে ওঠে বৈদ্যুতিক বাতি। ঢাকাবাসীর সামনে উন্মোচিত হয় আলোকিত নগরজীবনের নতুন সম্ভাবনা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা ছিল বাংলার ছোট লাট স্যার জন উডবার্নের। তবে অসুস্থতার কারণে তিনি আসতে পারেননি।

সেদিনই পুরো ঢাকা শহরে বিদ্যুতের আলো ছড়িয়ে পড়েনি। প্রথম পর্যায়ে আহসান মঞ্জিল ও শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

সাড়ে চার লাখ টাকায় বিদ্যুতের আলো

আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের ২০ নম্বর গ্যালারিতে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, নগরবাসীর দুর্দশা লাঘব, ঢাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে নবাব আহসানউল্লাহ প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকায় বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেন।

‘ঢাকার নবাব পরিবার ও তৎকালীন ঢাকার সমাজ’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে, ১৯০১ সালে ঢাকার রাস্তায় বিদ্যুতের বাতি স্থাপনের জন্য গঠিত হয় ‘দ্য ঢাকা ইলেকট্রিক লাইট ট্রাস্ট’। এই ট্রাস্টের তহবিলে নবাব আহসানউল্লাহ দান করেন সাড়ে চার লাখ টাকা। একই বছরের ৫ জুলাই ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও সড়কে বিদ্যুৎ সরবরাহের লাইসেন্স পেতে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে।

পরিকল্পনায় ছিল রহমতগঞ্জ, চকবাজার, মোগলটুলী, নালগোলা, বাবুবাজার, কমিটিগঞ্জ, ইসলামপুর, আহসান মঞ্জিল, পাটুয়াটুলী, বাংলাবাজার, ফরাশগঞ্জ, লক্ষ্মীবাজার, সদরঘাট, শাঁখারীবাজার, জনসন রোড ও নবাবপুরসহ শহরের বিভিন্ন এলাকা। তালিকায় ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক এবং রেলওয়ে স্টাফ কোয়ার্টার রোডও।

গ্যাসের বাতি দিয়ে শুরু হয়েছিল পরিকল্পনা

ঢাকার রাস্তায় আলো জ্বালানোর উদ্যোগ এক দিনের পরিকল্পনা ছিল না। এর পেছনে ছিল নবাব আহসানউল্লাহর দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি।

ঐতিহাসিক কেদারনাথ মজুমদারের উদ্ধৃতি দিয়ে ইতিহাস-গবেষক দেলওয়ার হাসানের ‘ঢাকার নবাব পরিবার ও তৎকালীন ঢাকার সমাজ’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৮৮৭ সালে নবাব আহসানউল্লাহর বাবা নবাব খাজা আবদুল গণি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘নাইট কমান্ডার অব দ্য স্টার অব ইন্ডিয়া’ (কেসিএসআই) উপাধি লাভ করেন। বাবার এই সম্মানপ্রাপ্তিতে খুশি হয়ে আহসানউল্লাহ ঢাকাবাসীকে আনন্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

বইটিতে আরও বলা হয়েছে, কলকাতার ইংরেজি সংবাদপত্র ইংলিশম্যান সে সময় এ বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে উল্লেখ করা হয়, বাবার উপাধি লাভের ঘটনায় নগরবাসীর আনন্দ ও সৌজন্যের প্রতিদান হিসেবে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে নিজের খরচে তেলের বাতির পরিবর্তে গ্যাসের বাতি স্থাপনের প্রস্তাব দেন আহসানউল্লাহ।

তবে তাঁর শর্ত ছিল, আলোর জন্য যে অর্থ ব্যয় হবে, তার বিনিময়ে মিউনিসিপ্যালিটিকে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দমকলের যন্ত্রপাতি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

১৮৮৮ সালে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন ঢাকা সফরে এলে গ্যাসের বাতি স্থাপনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ১৮৯১ সালে নবাব আহসানউল্লাহর আইনবিষয়ক সচিব জি এল গার্থ ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির কাছে এ বিষয়ে একটি স্মারকলিপিও পাঠান। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে নবাব আহসানউল্লাহ সরাসরি বিদ্যুতের বাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেন।

বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাণিজ্যিক সরবরাহ

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের কাজে যুক্ত হয় ইংল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেসার্স অক্টাভিয়াস স্টিল অ্যান্ড কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল বর্তমান হাতিরপুল এলাকায়।

১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির অঙ্গসংগঠন হিসেবে ডেভকোর আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে ডেভকোর মাধ্যমে ঢাকায় বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি পরীবাগে ছয় মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ধানমন্ডি পাওয়ার হাউস স্থাপন করে।

তবে ঢাকায় বিদ্যুতের আলো চালুর আগেও পূর্ববঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নজির ছিল। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের ভাওয়াল পরগনার রাজা ঊনবিংশ শতাব্দীতেই বিলাত থেকে আনা জেনারেটরের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজের রাজবাড়ি আলোকিত করেছিলেন।

অতএব, ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বরকে পূর্ববঙ্গে প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবহারের দিন বলা ঠিক হবে না। বরং দিনটি ঢাকার নগরজীবনে বৈদ্যুতিক আলো চালুর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

বিদ্যুতের আলো জ্বলার ৯ দিন পর নবাবের মৃত্যু

ঢাকায় বিদ্যুতের আলো উদ্বোধনের মাত্র নয় দিন পর, ১৯০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মারা যান নবাব আহসানউল্লাহ। তিনি হৃদ্‌রোগে ভুগছিলেন।

ঢাকা প্রকাশ-এর প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর ‘নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়’ বইয়ে লিখেছেন, আহসানউল্লাহ বিষয়সম্পত্তি নিয়ে মানসিক চাপে ছিলেন এবং হৃদ্‌রোগেও ভুগছিলেন। তবে বাইরে থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থা এতটা খারাপ বলে বোঝা যেত না। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পূর্ববঙ্গের জনজীবনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।

ঢাকা প্রকাশ-এর আরেকটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিদ্যুতের আলো চালুর পর নবাব আহসানউল্লাহ নিয়মিত আহসান মঞ্জিলে থাকতেন।

শতাব্দী পেরিয়ে বিদ্যুতের বিস্তার

একসময় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক ও আহসান মঞ্জিলে বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে নগরজীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণব্যবস্থার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে আলো পৌঁছে যায় শহরের আরও বিস্তৃত এলাকায়, পরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা এখন প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশের ৯৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ খানা বা পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।

১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর আহসান মঞ্জিলে জ্বলে ওঠা সেই বৈদ্যুতিক বাতি তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি ঢাকার আধুনিক নগরজীবনের বিকাশের ইতিহাসে স্মরণীয় একটি অধ্যায়।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাশ্রয়ের নসিহত, আর দুর্নীতির অভিযোগ’—‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান

1

রাম চরণের ‘পেদ্দি’ মুক্তি পাচ্ছে ৪ জুন

2

গোলাম সারোয়ার মিলনের জানাজা সম্পন্ন

3

পুলিশের ঊর্ধ্বতন ১৭ কর্মকর্তাকে বদলি

4

কক্সবাজারের টেকনাফে ৭৫ লাখ টাকার ইয়াবা জব্দ

5

শিশুদের কান্নার শব্দ পুঁজি করে ইসরাইলি ফাঁদ

6

পুলিশ প্রশিক্ষণে সহযোগিতা দেবে ইউনেস্কো

7

ভণ্ড হুজুর ফেসবুকটা নোংরা বানায় ফেলতেছে : মারিয়া মিম

8

বিতর্কিত গান নিয়ে ক্ষমা চাইলেন নোরা ফাতেহি

9

যে স্কুলে পড়তে গিয়েছিল শিশুরা, সেখানেই ঝরল ২৮ শিশুর প্রাণ

10

বিশ্বকাপের ফাইনাল কবে-কোথায়-কখন, জেনে নিন

11

দেখে নিন আর্জেন্টিনার জয়ের খতিয়ান

12

এনটিএমসিতে ৩ পদে নিয়োগ, আবেদন ২৮ জুন পর্যন্ত

13

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে জানলেন তিনি ‘মৃত’

14

ঈদের দিন বর্জ্য অপসারণের সময় নির্ধারণ ঢাকা উত্তরের

15

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার কেন্দ্র করা হবে

16

মেসির সঙ্গে ইয়ামালের তুলনা থামিয়ে দিলেন এনরিকে, বললেন যা

17

হামে আরও ৫ মৃত্যু, শনাক্ত ৭৯৬

18

‘মোহাম্মদ’ নাম নিয়ে ট্রাম্পের কটাক্ষ, ইরানের প্রেসিডেন্ট পদ

19

বিশ্বকাপের স্বপ্নের একাদশে স্পেনের তিন, আর্জেন্টিনার দুই, ব্

20