পবিত্র কোরআন ও হাদিসে কিয়ামত দিবসের কঠিন পরিস্থিতির কথা বর্ণিত হয়েছে। সেদিন মানুষকে নিজের আমলের হিসাব দিতে হবে এবং আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। এ ভাবনা মুমিনের অন্তরে যেমন ভয় জাগায়, তেমনি আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার আশাও জাগিয়ে তোলে।
ইসলামে ‘হিসাবে ইয়াসির’ বা সহজ হিসাবের কথা বলা হয়েছে। কোরআন-হাদিসে ঈমান, তাওবা, সৎকর্ম, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং মানুষের প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এসব শিক্ষা অনুসরণ করে আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত কামনা করা মুমিনের কর্তব্য।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব নেওয়া হবে সহজভাবে।’ (সুরা আল-ইনশিকাক, আয়াত ৭-৮)
এখানে সহজ হিসাবের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। ইসলামি ব্যাখ্যায় সহজ হিসাব বলতে বান্দার আমল উপস্থাপন ও তার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের বিষয়টি বোঝানো হয়। তবে কার হিসাব কীভাবে হবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নেওয়া হবে, সে শাস্তির মুখোমুখি হবে। আয়েশা (রা.) সহজ হিসাবের আয়াতের কথা উল্লেখ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যাখ্যা করেন, সেটি মূলত আমলনামা পেশ করা; আর যার হিসাব খুঁটিয়ে নেওয়া হবে, তার জন্য তা কঠিন হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৫৩৭)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, কিয়ামতের দিনের হিসাবের বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং আল্লাহর রহমত কামনা করা জরুরি।
পাপ থেকে ফিরে আসা এবং সৎকর্মের মাধ্যমে জীবন গড়ে তোলার প্রতি কোরআনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তবে যারা তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭০)
তাই ভুল বা গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আন্তরিকভাবে তাওবা করা, গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং সৎকর্মে মনোযোগী হওয়া উচিত। শুধু ক্ষমার আশা করে ইচ্ছাকৃতভাবে পাপে লিপ্ত থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, তাঁর উম্মতের একটি দল বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাঁদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা এবং কুসংস্কারনির্ভর আচরণ থেকে দূরে থাকা।
এ শিক্ষা মুমিনকে আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে উৎসাহিত করে। তবে চিকিৎসা গ্রহণ বা বৈধ উপায়ে সাহায্য চাওয়াকে কুসংস্কারের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
হজরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ মুমিন বান্দাকে কাছে নিয়ে তার গুনাহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। বান্দা নিজের গুনাহ স্বীকার করার পর আল্লাহ জানাবেন যে দুনিয়ায় তিনি সেগুলো গোপন রেখেছিলেন এবং সেদিন সেগুলো ক্ষমা করে দেবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৪১)
এই বর্ণনা আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের প্রতি আশা জাগায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করে যেতে পারে। বরং গুনাহ থেকে ফিরে আসা, অনুতপ্ত হওয়া এবং নিজেকে সংশোধন করাই মুমিনের কর্তব্য।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, প্রকাশ্যে নিজের গুনাহের কথা প্রচার করা নিন্দনীয়। কোনো ব্যক্তি রাতে গুনাহ করার পর আল্লাহ তা গোপন রাখলেন, কিন্তু সকালে সে নিজেই তা মানুষের কাছে প্রকাশ করে বেড়াল—এটি আল্লাহর দেওয়া আড়ালকে নিজ হাতে সরিয়ে দেওয়ার মতো।
তাই গুনাহ হয়ে গেলে তা নিয়ে অহংকার বা প্রচার না করে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা করা উচিত। তবে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে শুধু বিষয়টি গোপন রাখাই যথেষ্ট নয়; ক্ষতি পূরণ ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করতে হবে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার কষ্ট দূর করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তের জন্য সহজতা সৃষ্টি করে, আল্লাহ তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সহজতা সৃষ্টি করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৯৯)
এ হাদিস মানুষকে পরোপকারী হতে, অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে এবং অন্যের সম্মান রক্ষা করতে শিক্ষা দেয়।
ইসলামে আল্লাহর হকের পাশাপাশি মানুষের অধিকারের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা, অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া, অপবাদ দেওয়া বা অধিকার নষ্ট করার মতো কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। কারও প্রতি অন্যায় হয়ে থাকলে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি সম্ভব হলে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
কিয়ামতের দিনের সফলতা কেবল মুখের কথায় নয়; ঈমান, সৎকর্ম, আন্তরিক তাওবা এবং মানুষের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিয়ামতের দিন সহজ হিসাব ও আল্লাহর ক্ষমা লাভের জন্য মুমিনের উচিত ঈমানের ওপর অটল থাকা, গুনাহ থেকে ফিরে আসা, নিয়মিত নেক আমল করা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করা।
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে নিজের ভুল সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবার হিসাব সহজ করুন, গুনাহ ক্ষমা করুন এবং তাঁর রহমতে জান্নাত দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন