অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

ইয়েমেনের হাসপাতালে মৃত্যুঝুঁকিতে নবজাতক

অক্সিজেন নেই, জ্বালানি নেই—ইয়েমেনের হাসপাতালে মৃত্যুঝুঁকিতে নবজাতক

ইয়েমেনের অবরুদ্ধ তাইজ শহরে জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, একটি হাসপাতালে নবজাতকদের জন্য ব্যবহৃত ইনকিউবেটরের সংখ্যা ৪০টি থেকে কমিয়ে মাত্র ১০টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে অকালজাত ও অসুস্থ শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে অক্সিজেন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

জ্বালানি সংকটে বন্ধ হওয়ার পথে হাসপাতাল

তাইজের ইয়েমেনি-সুইডিশ হাসপাতালের নবজাতক পরিচর্যা বিভাগের নার্স নাদা আহমেদ বলেন, অক্সিজেন, ইনকিউবেটর চালানোর জ্বালানি এবং শিশুদের উষ্ণ রাখার ব্যবস্থার সংকট দেখা দিয়েছে।

বিভাগটির তত্ত্বাবধায়ক নওয়াল নাজিব সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে নবজাতকদের মৃত্যু এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়বে।

বিচ্ছিন্ন তাইজ, বাধাগ্রস্ত মানবিক সহায়তা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩ অক্টোবর থেকে ইয়েমেনের তাইজ শহর অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলনের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং বেসামরিক মানুষের শহর ছেড়ে যাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তাইজ-আদেন করিডরসহ গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ বন্ধ থাকায় খাদ্য, পানি ও জ্বালানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে বাস্তুচ্যুত আড়াই লাখ মানুষের প্রায় অর্ধেক তাইজ শহরে আশ্রয় নিয়েছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার জানান, শহরটির ৪২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জ্বালানি, অক্সিজেন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

লিটারপ্রতি জ্বালানির দাম দুই হাজার রিয়াল

জ্বালানির সংকটে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় গাড়িচালক আবদুল্লাহ আল-রাদফানি রয়টার্সকে জানান, তাইজে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম বেড়ে দুই হাজার ইয়েমেনি রিয়ালে দাঁড়িয়েছে।

অক্সফাম ইয়েমেনের নীতি ও গণমাধ্যমবিষয়ক ব্যবস্থাপক ফাতমা জাফর শোতাহ জানান, যাতায়াতের খরচ বহন করতে না পেরে এক কিডনি রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্রেই দুই রাত থাকতে হচ্ছে। আগে যাতায়াতে যেখানে প্রায় আধা ডলার খরচ হতো, এখন তা বেড়ে প্রায় ১০ ডলারে পৌঁছেছে।

তাইজের বাইরেও একই সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় আদেন ও লাহিজ প্রদেশের হাসপাতাল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে অস্ত্রোপচারকক্ষ ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

খাদ্যাভাব ও অপুষ্টিতে বিপর্যস্ত শিশুরা

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি খাদ্যাভাব ও অপুষ্টিও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, তাইজ ও আশপাশের এলাকায় আট লাখের বেশি মানুষ খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস জানান, চলতি বছরে তাইজে পরীক্ষা করা এক লাখ ৬৮ হাজার শিশুর মধ্যে ৫২ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি শিশু গুরুতর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত।

ইউনিসেফ প্রায় আট হাজার কার্টন জীবনরক্ষাকারী বিশেষ পুষ্টিকর খাবার মজুত করেছে। সংস্থাটির হিসাবে, এসব খাবার দিয়ে প্রায় তিন মাস চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো সম্ভব। তবে নিরাপত্তাহীনতা ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ভবিষ্যতে এসব খাবার সরবরাহ এবং অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

দক্ষিণ ইয়েমেনেও বাড়ছে অপুষ্টির ঝুঁকি

এমএসএফ জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিম উপকূলের সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা পরিবারগুলোর কারণে দক্ষিণ ইয়েমেনে শিশুদের অপুষ্টির পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত আদেন ও লাহিজে সংস্থাটির ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৯৯ শিশুর পুষ্টি পরীক্ষা করা হয়। তাদের মধ্যে ৪৪ শিশু, অর্থাৎ ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, মাঝারি মাত্রার তীব্র অপুষ্টিতে এবং ২৮ শিশু, অর্থাৎ ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, গুরুতর অপুষ্টিতে ভুগছিল। গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে চিকিৎসা প্রয়োজন।

এমএসএফের ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক সারা ঘানেম বলেন, তাঁরা প্রতিদিন যেসব এলাকায় যান, সেখানে অন্তত এক বা দুই শিশুকে গুরুতর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত অবস্থায় দেখতে পান।

জ্বালানি ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট, বাধাগ্রস্ত মানবিক সহায়তা এবং ক্রমবর্ধমান অপুষ্টি—সব মিলিয়ে ইয়েমেনের তাইজ শহরে স্বাস্থ্য ও মানবিক পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো না গেলে নবজাতক ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের জীবন আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নেপাল বিপর্যয়ে দায় এড়াল চীন, কাঠমাণ্ডু-বেইজিং সম্পর্কে ফাটল

1

ফাইনালে গুরু-শিষ্যের লড়াই, মুখোমুখি ফুয়েন্তে ও স্কালোনি

2

ঈদের আগে কমল স্বর্ণের দাম

3

কুমিল্লা পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহারের দাবিকৃত চিঠি ভুয়া

4

পাকিস্তানের ফার্স্ট লেডি বিবি আসিফা কি নির্দেশ করলেন

5

রামপুরায় কলেজ শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার

6

বাংলা সিনেমার উন্নতি কেউ চায় না : শাকিব খান

7

ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু কানাডার

8

স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ

9

মেসিকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা এমবাপ্পে

10

দেশে সারের সংকট নেই, মজুদ ১৩ লাখ ৫০ হাজার টন: কৃষিমন্ত্রী

11

একসঙ্গে মরব বলে যমুনায় ঝাঁপ দিলেন প্রেমিক,পালালেন প্রেমিকা

12

মধ্যপ্রাচ্যকে বড় যুদ্ধ থেকে বাঁচিয়েছে সৌদি আরবের কৌশলী অবস্থ

13

প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে নিয়োগ পরীক্ষা তদারকিতে প্রতিমন্ত্রী

14

যেসব কারণে মমতার দলের ভরাডুবি

15

২০২৬ বিশ্বকাপে খেলছেন মেসি, নিশ্চিত করলেন কোচ আয়ালা

16

ইউরোপ সফরে বাংলাদেশ দলে যোগ দিলেন হামজা

17

কাতারের শেষ মুহূর্তের গোলে সুইজারল্যান্ডের জয় হাতছাড়া

18

পশু জবাই বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে জনস্বার্থ মামলা মহ

19

আর্জেন্টিনাকে আমরা ১-০ গোলে হারাব: কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্ট

20