অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

গাজায় ছেলের মৃত্যু, নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার গল্প

গাজায় ছেলের মৃত্যু কি রাজনীতিতে এনেছে গাদি আইজেনকটকে?

ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। তাঁর নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। দীর্ঘ সামরিক জীবন শেষে রাজনীতিতে আসা আইজেনকটের ব্যক্তিগত জীবনেও গাজা যুদ্ধ গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের অভিযানে নিহত হন তাঁর ২৫ বছর বয়সী ছেলে গাল। তাঁর দুই ভাতিজাও যুদ্ধে প্রাণ হারান।

ছেলের মৃত্যু কি আইজেনকটকে রাজনীতিতে আরও সক্রিয় করে তুলেছে? তাঁর বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধের মূল্য, সরকারের জবাবদিহি এবং ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তানীতি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

কে এই গাদি আইজেনকট?

গাদি আইজেনকটের জন্ম মরক্কো থেকে ইসরায়েলে অভিবাসী হওয়া একটি পরিবারে। তিনি মিজরাহি ইহুদি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত আশকেনাজি ও মধ্যপ্রাচ্য-উত্তর আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত মিজরাহি ইহুদিদের মধ্যে প্রতিনিধিত্ব ও বৈষম্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

৬৬ বছর বয়সী আইজেনকটের বেড়ে ওঠা তিবেরিয়াস ও ইলাত অঞ্চলে। তাঁর রাজনৈতিক জীবন নেতানিয়াহুর অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে থাকলেও আইজেনকটের পরিচিতি মূলত সামরিক বাহিনীতে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের কারণে।

বিশ্লেষকদের মতে, আইজেনকটের পারিবারিক পরিচয় ও জীবনপথ কিছু ভোটারের কাছে তাঁকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। তবে তাঁর জনপ্রিয়তার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে—সামরিক অভিজ্ঞতা, নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা এবং জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি।

চার দশকের সামরিক জীবন থেকে রাজনীতিতে

১৯৭৮ সালে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর গোলানি ব্রিগেডে যোগ দেন আইজেনকট। চার দশকের সামরিক জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ২০১৫ সালে বাহিনীর চিফ অব স্টাফ হন তিনি। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন।

সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর ২০২২ সালে সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গ্যান্টজের সঙ্গে রাজনীতিতে যোগ দেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর তিনি ও গ্যান্টজ নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।

তবে যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে মতবিরোধের মধ্যে ২০২৪ সালের জুনে তাঁরা মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে যান। আইজেনকটের অভিযোগ ছিল, যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে সুস্পষ্ট কৌশল ও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।

ছেলের মৃত্যু বদলে দিয়েছে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার?

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় লড়াইয়ের সময় নিহত হন আইজেনকটের ছেলে গাল। তাঁর দুই ভাতিজাও যুদ্ধে প্রাণ হারান। এই ব্যক্তিগত শোক তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে।

২০২৬ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলি সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনথে লেখা এক নিবন্ধে আইজেনকট ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দেওয়া শপথের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, গাল ও তাঁর সহযোদ্ধারা যে মূল্য দিয়েছেন, তা বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না।

এই বক্তব্যে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও জবাবদিহির বিষয়টি উঠে আসে। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের সিদ্ধান্তের একমাত্র কারণ ছেলের মৃত্যু—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই। তিনি ২০২২ সালেই রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন, অর্থাৎ গাজার যুদ্ধে ছেলেকে হারানোর আগেই তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল।

৭ অক্টোবরের হামলা নিয়ে তদন্তের প্রতিশ্রুতি

আইজেনকটের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন। তাঁর মতে, ওই হামলার পেছনের ব্যর্থতা চিহ্নিত করা এবং দায় নির্ধারণ করা জরুরি।

নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্যের একটি বড় জায়গা এই তদন্ত। আইজেনকটের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

এ ছাড়া সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বা জাতীয় সেবার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। বর্তমানে নেতানিয়াহুর জোটের কয়েকটি দল কট্টরপন্থী অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক ও জাতীয় সেবা থেকে ছাড় অব্যাহত রাখার পক্ষে।

নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোথায় পার্থক্য?

আইজেনকটের নির্বাচনী প্রচারের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে জবাবদিহি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং সামরিক সেবায় সমান দায়িত্ব। তাঁর দল ইয়াশারের নামের হিব্রু অর্থ ‘সোজা’।

তবে নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকটের সব পার্থক্য নেই। ইরান ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সক্ষমতা কমানোর বিষয়ে তাঁদের অবস্থানের মিল রয়েছে। আইজেনকটও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে।

তাঁর সঙ্গে নেতানিয়াহুর বিরোধের একটি বড় জায়গা হলো সামরিক অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে এবং তার সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও রাজনৈতিক পরিকল্পনার সমন্বয় কতটা থাকবে। আইজেনকটের সমালোচনা, সামরিক সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়েও স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

গাজা নিয়ে আইজেনকটের পরিকল্পনা কী?

গাজা বিষয়ে আইজেনকট হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ লক্ষ্য অর্জনে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অথবা বিকল্প সামরিক পদক্ষেপের কথা বলেছেন।

তাঁর বক্তব্যে হামাসের শাসন শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহুর যুদ্ধকৌশলের সমালোচনা করলেও আইজেনকট গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের মৌলিক লক্ষ্যগুলোর বিরোধিতা করেননি।

তাই তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতিতে কতটা পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে জোটের অংশীদার, যুদ্ধবিরতির বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ওপর।

নির্বাচনে কী বলছে বুথফেরত জরিপ?

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর প্রকাশিত বুথফেরত জরিপে ইসরায়েলের কোনো জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের জরিপে আসনসংখ্যায় পার্থক্য দেখা গেছে। চ্যানেল টুয়েলভের একটি হালনাগাদ জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের জন্য ৫২টি, আইজেনকটের বিরোধী শিবিরের জন্য ৪৯টি এবং আরব দলগুলোর জন্য ১৯টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। অন্য কিছু জরিপে বিরোধী শিবির সামান্য এগিয়ে ছিল। <Cite refs={["turn111350search0","turn111350search2"]}/>

ইসরায়েলের সংসদ নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন। ফলে শুধু কোনো দল সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই সরকার গঠন নিশ্চিত হয় না; সম্ভাব্য জোটের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ।

বুথফেরত জরিপ চূড়ান্ত ফল নয়। আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ ও জোট গঠনের আলোচনা শেষ হওয়ার আগে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কে গঠন করবেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

আইজেনকটের সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

নেতানিয়াহুর বিরোধী শিবিরকে একত্র করা, ভিন্নমতের দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করা এবং নিরাপত্তা বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা—আইজেনকটের সামনে এসব বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর সামরিক অভিজ্ঞতা ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে সরকার গঠনের জন্য সংসদীয় সমর্থন অর্জনও সমান জরুরি।

গাজা যুদ্ধে পরিবারের সদস্যদের হারানোর অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তবে আইজেনকটের রাজনৈতিক অবস্থান বুঝতে ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি তাঁর সামরিক অতীত, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং ফিলিস্তিন ও ইরান বিষয়ে নীতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

একসঙ্গে মরব বলে যমুনায় ঝাঁপ দিলেন প্রেমিক,পালালেন প্রেমিকা

1

৪৬৩ কোটি টাকায় টিকা ও ওষুধ কিনবে সরকার

2

বিশ্বকাপের হতাশা ভুলে ফুরফুরে মেজাজে আবারও মাঠে মেসি

3

‘বিশ্বাসঘাতকদের’ তীব্র নিন্দা জানালেন ট্রাম্প

4

সুইজারল্যান্ডে শুরু হচ্ছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাস্তবায়ন

5

হাইপারসনিক ‘ডার্ক ইগল’ ক্ষেপণাস্ত্র আনছে যুক্তরাষ্ট্র

6

মায়ের সঙ্গে আবেগঘন পুনর্মিলনে কাঁদলেন ভোজিনিয়া

7

এক নেটওয়ার্কে আসছে দেশের সব টোলপ্লাজা

8

হঠাৎ কেন ভাইরাল ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গান, জেনে নিন ঘটনা

9

যুক্তরাষ্ট্রের উসকানিতে ইরানি দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা

10

এমবাপে নিশ্চিত, ফাইনালেও গোল করবেন মেসি

11

ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় আর্জেন্টিনাকে সমর্থন হোয়াইট হাউসের

12

নিজেদের চরকায় তেল দিন, জুয়ার বিতর্কে রেগে সমালোচকদের জবাব নে

13

বন্ধ কারখানা সচল করতে বিশেষ তহবিল হচ্ছে

14

মেঘনায় ঝড়ের কবলে ট্রলারডুবি নিখোঁজ ৩

15

হাদি হত্যা ইস্যুতে বিস্ফোরক দাবি মমতার

16

আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ মিসরের ভাগ্য বদলেছেন যমজ দুই ভাই

17

মেসি এই গ্রহের বাসিন্দা নন, মুগ্ধ কিংবদন্তিরা

18

হজে খরচ কমাতে বিমান ভাড়া হ্রাস : ধর্মমন্ত্রী

19

মানবজাতিকে বিলুপ্ত করতে যতগুলো পরমাণু বোমা লাগবে

20