ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কাছ থেকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেওয়ার মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন হালিমা সালমান নামের এক মার্কিন নারী। কিশোরী বয়সে বাবার সঙ্গে সিরিয়ায় যাওয়ার পর তাঁকে আইএসের এক যোদ্ধার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাঁর সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি তাঁর সাজা ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দেওয়া এ রায়ে আদালত হালিমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানান। তবে তাঁর আইনজীবীরা রায় বাতিল করে খালাস দেওয়ার আবেদন করছেন।
মার্কিন আইনজীবীদের দাবি, হালিমা সালমান আইএসের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিলেন এবং স্বেচ্ছায় সংগঠনটির কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন। বিচার চলাকালে আদালতে একটি ভিডিও দেখানো হয়, যেখানে তাঁকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে দেখা যায়। আইএসের পতাকার সঙ্গে তাঁর একটি ছবিও উপস্থাপন করা হয়।
এ ছাড়া স্বামীর কাছে পাঠানো তাঁর কয়েকটি স্নেহপূর্ণ খুদে বার্তা আদালতে তুলে ধরেন আইনজীবীরা। তাঁদের বক্তব্য, এসব প্রমাণ সিরিয়ায় হালিমার ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর নিজের বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ব্রুকলিনের মার্কিন অ্যাটর্নি জোসেফ নোসেলা জুনিয়র এক বিবৃতিতে বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য হালিমাকে দায়ী করা হয়েছে।
অন্যদিকে হালিমার আইনজীবীদের দাবি, কিশোরী বয়সে বাবার সঙ্গে সিরিয়ায় যাওয়ার পর তিনি গৃহযুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়েন এবং চরমপন্থী স্বামীর নিয়ন্ত্রণে থাকতে বাধ্য হন।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া হালিমার বয়স যখন ১৭ বছর, তখন ২০১৭ সালে তাঁর বাবা পুরো পরিবারকে নিয়ে সিরিয়ায় যান। হালিমা ভেবেছিলেন, তাঁরা তুরস্কে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের বহনকারী ভ্যানটি সিরিয়ায় প্রবেশ করলে মুখোশ পরা কয়েকজন বন্দুকধারী তাঁদের ঘিরে ধরে।
আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে হালিমা বলেন, তিনি ভয় পেয়েছিলেন এবং কী ঘটছে, তা বুঝতে পারছিলেন না। তাঁর বাবা তাঁদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, সে সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ছিল না।
হালিমার ভাষ্য, পরিবারের সঙ্গে আবার মিলিত হওয়ার আগে তিনি তিন মাস আইএস পরিচালিত একটি আবাসনকেন্দ্রে ছিলেন। বিমান হামলায় তাঁদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুবার বাসা বদল করতে হয়েছিল।
তিনি বলেন, যা ঘটেছে, তার অনেক কিছুর জন্য তিনি বাবাকে দায়ী করেন।
হালিমার আইনজীবীদের বক্তব্য, ১৮ বছর বয়সে তাঁকে আইএসের এক যোদ্ধার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। তিনি এ বিয়েতে রাজি ছিলেন না এবং পরে একাধিকবার বিবাহবিচ্ছেদের চেষ্টা করেছিলেন।
আদালতে হালিমা জানান, স্বামীর নির্দেশ অমান্য করার সুযোগ তাঁর খুব কম ছিল। তাঁর ভাষ্য, স্বামীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে প্রাণ হারানোর আশঙ্কা ছিল।
বিয়ের প্রথম দিনের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি জানান, স্বামী তাঁকে অপমানজনক ভাষায় সম্বোধন করেছিলেন। দাম্পত্য জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি স্বামী ও শাশুড়ির জন্য ঘরের কাজ করতেন।
২০১৮ সালে বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর তাঁর বাবা মারা যান বলে হালিমা জানান।
হালিমার বর্ণনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মার্কিন আইনজীবীরা। তাঁদের দাবি, সিরিয়ায় নিজের ভূমিকা এবং সেখানে তাঁর স্বাধীনতার পরিমাণ সম্পর্কে হালিমা পুরো সত্য বলেননি।
জেরার সময় আইনজীবীরা তাঁকে স্বীকার করতে বলেন, তিনি একবার ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে একটি ধর্মীয় গান স্বামীকে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর দাম্পত্য জীবন ভালো ছিল না—এ বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এ সময় স্বামীর কাছে পাঠানো দুটি স্নেহপূর্ণ খুদে বার্তা আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
সহকারী মার্কিন অ্যাটর্নি আমান্ডা শামি সমাপনী বক্তব্যে বলেন, উপস্থাপিত প্রমাণে দেখা গেছে, হালিমা একটি সহিংস সন্ত্রাসী সংগঠনের কাছ থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
আইনজীবীদের দাবি, তাঁর স্বামী একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে থাকা অবস্থায় তাঁর ভিডিও ধারণ করেছিলেন এবং তাঁকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তবে হালিমার বক্তব্য, স্বামীর অনুরোধেই তিনি রাইফেলটি হাতে নিয়েছিলেন।
হালিমা জানান, দাম্পত্য জীবনের শেষ বছরটি ছিল বিশেষভাবে ভয়াবহ। সে সময় প্রায়ই বোমা হামলা হতো। কখনো কখনো হামলার কারণে তাঁদের রাস্তায় রাত কাটাতে হতো।
সেই সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করে তিনি বলেন, চারদিকে শুধু মৃতদেহ দেখতে পেতেন।
একপর্যায়ে অন্য শরণার্থীদের সঙ্গে একটি ট্রাকে করে তাঁরা পালিয়ে যান। ট্রাকে থাকতেই হালিমা স্বামীকে জানান, তাঁরা আলাদা হয়ে যাবেন। আদালতে তিনি বলেন, এরপর আর কখনো স্বামীকে দেখেননি।
২০১৯ সালে সিরিয়ার বাঘুজ এলাকায় আইএসবিরোধী বাহিনীর হাতে আটক হন হালিমা। পরে ২০২৪ সালে নিউইয়র্কে ফিরে এলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
রায় ঘোষণার পর হালিমা, তাঁর মা ও আইনজীবীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে আদালতের দর্শকসারি ও বিচারকাজ পরিচালনার অংশের মাঝখানে থাকা রেলিংয়ের দুই পাশ থেকে মা-মেয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।
মামলার বিচারকেরা বৃহস্পতিবার থেকে রায় নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। সোমবার তাঁরা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তাঁদের সমস্যা হচ্ছে। তবে রায় ঘোষণার পর আদালত থেকে বের হওয়ার সময় তাঁরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
হালিমার আইনজীবীরা রায় বাতিল করে তাঁকে খালাস দেওয়ার আবেদন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে, উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব না হলে বিচারক রায় বাতিল করে খালাস দিতে পারেন। তবে এ ধরনের আবেদন খুব কম ক্ষেত্রেই মঞ্জুর হয়।
এ অপরাধে হালিমার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি তাঁর সাজা ঘোষণা করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার আইএসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০১৪ সালে সংগঠনটি ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা দখল করে নিজেদের তথাকথিত খিলাফত ঘোষণা করেছিল।
২০১৭ সালে ইরাকে এবং ২০১৯ সালে সিরিয়ায় সংগঠনটি ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ হারায়। তবে দুই দেশেই এর সদস্যদের গোপন তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে এবং তারা বিভিন্ন সময়ে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে।
মন্তব্য করুন