অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

আল্লাহর নৈকট্য পেতে মুমিনের ১০ আমল

আল্লাহর নৈকট্য লাভের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ আমল

মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার জন্য সময় বের করে এবং তার কথা মেনে চলার চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলার প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষাও একজন মুমিনের জীবনে এমনই গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহর পরিচয়, তাঁর অসীম ক্ষমতা, দয়া ও অনুগ্রহ সম্পর্কে যত বেশি জানা যায়, অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসা তত গভীর হয়। এই ভালোবাসা থেকেই তৈরি হয় ইবাদতের প্রতি আগ্রহ এবং রবের সঙ্গে বান্দার গভীর সম্পর্ক।

আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য শুধু ইবাদত করাই যথেষ্ট নয়; বরং ইবাদতের প্রতি আন্তরিকতা, নিয়মিত আমল এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টাও জরুরি। একজন মুমিনের জীবনে নিচের ১০টি আমলের চর্চা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

১. আল্লাহর পরিচয় ও মহত্ত্ব উপলব্ধি করা

আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও ইবাদতের আগ্রহ বাড়ানোর অন্যতম উপায় হলো তাঁর পরিচয় জানা। তাঁর অসীম ক্ষমতা, দয়া, অনুগ্রহ ও মহত্ত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য বৃদ্ধি পায়।

মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে তার জীবন, জীবিকা, সুস্থতা এবং প্রতিটি নিশ্বাস আল্লাহর দান, তখন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আগ্রহ তৈরি হয়।

সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করা, আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে জানা এবং তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করা অভ্যাসে পরিণত হলে ইবাদত কেবল আনুষ্ঠানিকতা থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯০)

২. ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলত জানা

যে কাজের মর্যাদা ও প্রতিদান সম্পর্কে মানুষ জানে, সেই কাজের প্রতি তার আগ্রহও বৃদ্ধি পায়। নামাজ, রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও সদকার ফজিলত সম্পর্কে জানা মুমিনকে নেক আমলে উৎসাহিত করে।

বিশেষ করে রমজানের ইবাদতের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮)

তাই ইবাদতের ফজিলত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং সেই অনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

৩. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে যত্নবান হওয়া

নামাজ একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটি। এর মাধ্যমে বান্দা প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পায়।

নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া, সময়মতো আদায় করা এবং একাগ্রতার সঙ্গে ইবাদত করা মুমিনের জীবনকে সুশৃঙ্খল করে। তাই দিনের অন্যান্য কাজের সঙ্গে নামাজের সময়কে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ সফলকাম, যারা তাদের নামাজে আন্তরিকভাবে বিনীত।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২)

৪. নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করা

পবিত্র কোরআন আল্লাহ তাআলার কালাম এবং মানুষের জন্য সর্বোত্তম পথনির্দেশনা। কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি আসে, ইমান বৃদ্ধি পায় এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা গভীর হয়।

আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন পাঠ করা, এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং জীবনে কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় ভীত হয়, যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পড়া হয়, তখন তা তাদের ইমানের উন্নতি সাধন করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২)

৫. জিকির ও দোয়ায় অভ্যস্ত হওয়া

আল্লাহর স্মরণ অন্তরকে জীবিত রাখে এবং দুনিয়ার ব্যস্ততার মধ্যেও প্রশান্তি এনে দেয়। সকাল-সন্ধ্যার জিকির, নামাজের পর তাসবিহ-তাহলিল এবং বিভিন্ন সময়ে দোয়া করার অভ্যাস একজন মুমিনকে আল্লাহমুখী করে তোলে।

কাজের ফাঁকে, চলার পথে কিংবা অবসর সময়ে আল্লাহকে স্মরণ করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এতে প্রতিদিনের জীবনে আল্লাহর স্মরণ অব্যাহত থাকে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের জিকির করে আর যে ব্যক্তি জিকির করে না, তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের মতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪০৭)

৬. পুণ্যবান মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা

মানুষের চিন্তা, আচরণ ও অভ্যাস গঠনে সঙ্গের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো মানুষের সাহচর্য নেক আমলের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে এবং পাপ থেকে দূরে থাকতে অনুপ্রাণিত করে।

তাই এমন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা উচিত, যাদের সাহচর্যে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, ইবাদতে উৎসাহ পাওয়া যায় এবং নৈতিক চরিত্র উন্নত হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ দিতে গিয়ে আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আতর বিক্রেতার কাছ থেকে সুগন্ধি পাওয়া যায়, আর কামারের হাপর কাপড় জ্বালিয়ে দেয় কিংবা তার কাছ থেকে শুধু দুর্গন্ধই পাওয়া যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৩৪)

৭. পাপ ও গুনাহ থেকে দূরে থাকা

পাপ মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে এবং ইবাদতের প্রতি অনীহা তৈরি করতে পারে। বারবার পাপের কাজে লিপ্ত হলে অন্তরের সংবেদনশীলতা কমে যায় এবং নেক আমলের প্রতি আগ্রহ হ্রাস পায়।

তাই দৃষ্টিকে সংযত রাখা, মিথ্যা ও পরনিন্দা থেকে বেঁচে থাকা, হারাম উপার্জন পরিহার করা এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

কোনো ভুল হয়ে গেলে দ্রুত আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। কারণ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা যুমার, আয়াত: ৫৩)

৮. নফল ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা

ফরজ ইবাদত মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। এর পাশাপাশি নফল ইবাদত আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাহাজ্জুদ, চাশতের নামাজ, নফল রোজা, সদকা এবং অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর আরও কাছে পৌঁছাতে পারে।

তাই ফরজ ইবাদতে যত্নবান হওয়ার পাশাপাশি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নফল ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)

৯. মৃত্যু ও পরকালের কথা স্মরণ করা

দুনিয়ার ব্যস্ততা ও মোহ অনেক সময় মানুষকে আখিরাতের কথা ভুলিয়ে দেয়। অথচ মৃত্যু জীবনের অবধারিত সত্য। একদিন সব ব্যস্ততা, আয়োজন ও অর্জন পেছনে ফেলে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।

মৃত্যু ও পরকালের কথা স্মরণ করলে মানুষ নিজের জীবন ও আমল সম্পর্কে সচেতন হয়। এতে ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার প্রেরণা তৈরি হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা স্বাদ বিনষ্টকারী বিষয়কে বেশি বেশি স্মরণ করো।’ অর্থাৎ মৃত্যুকে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৭)

১০. প্রতিদিন নিজের আমলের হিসাব নেওয়া

আত্মসমালোচনা মানুষের জীবন সংশোধনের অন্যতম উপায়। প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করলে ভুলত্রুটি চিহ্নিত করা যায় এবং পরবর্তী দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা সম্ভব হয়।

দিন শেষে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—আজ কতটুকু ইবাদত করেছি, কোন কাজে অবহেলা হয়েছে এবং কোন ভুল থেকে নিজেকে সংশোধন করা প্রয়োজন?

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, সে সম্পর্কে আল্লাহ পুরোপুরি অবগত।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ১৮)

শেষ কথা

আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর ভয় এবং নিয়মিত নেক আমলের চর্চা। প্রতিদিন অল্প হলেও নিয়মিত ইবাদত করা, পাপ থেকে বেঁচে থাকা এবং নিজের ভুল সংশোধনের চেষ্টা একজন মুমিনের জীবনকে আল্লাহমুখী করে তোলে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হচ্ছে, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৮৩)

তাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথে আজ থেকেই ছোট ছোট নেক আমল নিয়মিত করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইকুয়েডরের কাছে হার, একটি ভুলকেই দায়ী করলেন জার্মান কোচ

1

মেসিকে বিদায় জানাতে বিশেষ পরিকল্পনা আর্জেন্টিনার

2

দেশে এখনো ৪২% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে

3

বিদেশি শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপে বিধিনিষেধ জারি করল যুক্তরা

4

রাজধানীতে কড়া নিরাপত্তা, নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা

5

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীতে নিরাপত্তা শঙ্

6

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বড় জয়

7

সৌদির আকাশ সুরক্ষায় টাইফুন যুদ্ধবিমান দিচ্ছে যুক্তরাজ্য

8

শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরের বিধায়ক হিসেবে শপথ নিলেন

9

আমাদের নজর এড়িয়ে ইরানিরা বাথরুমেও যেতে পারে না: ট্রাম্প

10

অপ্রতিম হত্যা:স্বরাষ্ট্র সচিবকে ফোন করে কাঁদলেন এমপি

11

এইচএসসিতে কোন বোর্ডে পাসের হার কত, তালিকা প্রকাশ

12

জরুরি বৈঠকে ১১ দলের শীর্ষ নেতারা

13

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আসিয়ানের সক্রিয় ভূমিকা চায় বাংলাদেশ

14

গুম-খুন ও জুলাই শহীদ পরিবারের ৭৪ সদস্যকে চাকরি দিলেন প্রধানম

15

ইসলামে মানুষের প্রতি দয়া ও মানবসেবার গুরুত্ব

16

যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ২

17

মেসির বোঝা কমাতে আর্জেন্টিনার একাদশে আসছে ৩ বদল

18

বিএনপির পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ

19

জাল সাক্ষরে এদেশের সাধারণ মানুষ টাকা পাচার ; কত টাকা পাচারে

20