বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা বিশ্বকাপের মতো ফুটবল মহাযজ্ঞের বাণিজ্যিক স্বত্ব বা সংখ্যালঘু শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে । বিশ্ব ফুটবলে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করা ফিফার এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। দুই পরাশক্তির চরম দ্বন্দ্বের জেরে এখন ফুটবল বিশ্বকাপে বয়কটের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার ফিফা 'ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' (এফএফই) নামক একটি নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দেয়। এর অধীনে ফিফার সব ধরনের টুর্নামেন্টের সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ, টিকিট ও লাইসেন্সিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক স্বত্ব একত্র করে পরিচালনা করা হবে। এই এফএফইর সংখ্যালঘু শেয়ার বিক্রি করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ৪২০ কোটি মার্কিন ডলার তুলতে চায় ফিফা। পুরো এফএফইর বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২০০০ কোটি ডলার।
ফিফার এই অভূতপূর্ব প্রস্তাবে চটেছে উয়েফা। ইউরোপীয় এই সংস্থাটি এক ক্ষুব্ধ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ফিফা এবার ‘সীমারেখা পার করে গেছে’। খবর ছড়িয়ে পড়েছে, চলতি সপ্তাহেই ভার্চুয়ালি এক জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন উয়েফাভুক্ত দেশের প্রতিনিধিরা। স্কাই স্পোর্টস নিউজ জানিয়েছে, ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো যদি এই পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে না আসেন, তবে আগামী বিশ্বকাপ বয়কট করার মতো কঠিন পথ বেছে নেওয়ার হুমকি দিতে পারে ইউরোপের দেশগুলো।
উয়েফা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ‘ফুটবলের আত্মা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য হতে পারে না।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ফিফা এমন এক সীমারেখা অতিক্রম করেছে, যা কোনো ফুটবল পরিচালনা পর্ষদের কখনোই করা উচিত নয়। এটি ফুটবল সংস্থাগুলোর অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যাদেরই মাথাব্যথা আছে—লিগ, ক্লাব, খেলোয়াড়, সমর্থক থেকে শুরু করে সরকারগুলোরও এটি ভাবা উচিত। এর পেছনে কার আর্থিক লাভ লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে কোনো স্বচ্ছতাই নেই। ফুটবলের মালিক আমরা কেউ নই। ফিফারও অধিকার নেই খেলাটিকে বিক্রি করে দেওয়ার।’
এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম উয়েফার সুরে সুর মিলিয়ে কঠোর সমালোচনা করে এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘ফুটবল কোনো বিনিয়োগকারীদের সম্পদ নয়। এটি তাদের, যারা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সপ্তাহ শেষে গ্যালারি আর টাচলাইনে এসে দাঁড়ায়।’
অভিযোগ উঠেছে, নিউ ইয়র্কে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় হলেও এই বিশাল বাণিজ্যিক পরিকল্পনার বিষয়টি একদম চেপে রেখেছিল ফিফা। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) নাকি এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিন্দুমাত্র ঘুণাক্ষরও জানত না। অবশ্য বিতর্ক এড়াতে পরবর্তীতে বিবৃতি জারি করে ফিফা। তাদের দাবি, তারা একটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে এবং এটি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া কেবল শুরু হয়েছে। নতুন এই উদ্যোগ পরিচালনায় ব্যাংক সংস্থা জেপি মরগানকে আর্থিক উপদেষ্টা করার পাশাপাশি ট্রাইভ ক্যাপিটাল নামক এক সংস্থাকে বিনিয়োগকারী দল গঠনের মূল দায়িত্ব দেওয়ার কথা ফিফা নিশ্চিত করেছে।
ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোর দাবি, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে সারা বিশ্বের ফুটবলের বিকাশ ঘটবে এবং ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের বরাদ্দ অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে সমালোচকদের শঙ্কা, ইনফান্তিনোর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি নিজেই নতুন এই বাণিজ্য সংস্থার সিইও পদে বসতে যাচ্ছেন—যদিও ফিফা এ গুঞ্জন পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে।
উয়েফা প্রধান আলেকসান্দার সেফেরিন ও ইনফান্তিনোর বৈরী সম্পর্ক অনেক দিনের। বিশ্বকাপ ফাইনালও বর্জন করেছিলেন সেফেরিন। তবে এবার বিশ্বকাপের ‘বাণিজ্যিকিকরণ’ ও মালিকানার অংশ বিক্রির প্রশ্নে দুই শিবিরের মধ্যকার এই সংঘাত বিশ্ব ফুটবলকে কোন অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেয়, তা দেখার বিষয়।