বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হলেও সামনে রয়েছে জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শক্তিশালী জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও সরকারের জন্য পথ সহজ নয়; বরং অর্থনীতি, সুশাসন ও নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, নির্বাচন-পরবর্তী এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের উচিত দ্রুত সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া, যাতে জনগণ বুঝতে পারে তারা আগের রাজনৈতিক চর্চা থেকে সরে এসে নতুন পথে হাঁটছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনীতিই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরান সংশ্লিষ্ট সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দলটির কার্যক্রম বর্তমানে সীমাবদ্ধ থাকলেও তাদের বড় সমর্থনভিত্তি থাকায় দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির বাইরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা-এর নেতৃত্ব ইস্যু এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।
এছাড়া বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশ বাহিনীর প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনও জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু সময় অস্থিরতা থাকতে পারে, যা মোকাবিলায় সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন উগ্রবাদ ও সম্ভাব্য চরমপন্থী তৎপরতার বিষয়েও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য রক্ষা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিবেশী ভারত-এর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে, ক্রাইসিস গ্রুপের মূল্যায়ন অনুযায়ী নতুন সরকারের সামনে সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি ঝুঁকিও কম নয়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই হবে সরকারের সফলতার মূল চাবিকাঠি।
মন্তব্য করুন