ডেস্ক রিপোর্টার
প্রকাশ : রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

আগুন ভেদ করে প্রত্যাবর্তন

প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের পর আর্টেমিসের এক ক্রুকে নিয়ে যাচ্ছে ইউএসএস নেভি জাহাজ - নাসা

প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ নীল জলরাশি ভোরের আলোয় ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল। আকাশের গায়ে তখনও রাতের শেষ ছায়া লেগে আছে, আর পূর্ব দিগন্তে সূর্যের প্রথম সোনালি রেখা ছড়িয়ে পড়ছিল পৃথিবীর বুকে। ঠিক সেই সময়েই আকাশের নীরবতা ভেদ করে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছিল আগুনে মোড়া ওরিয়ন মহাকাশযান। এটি ছিল মানবসভ্যতার অন্যতম উন্নত গভীর মহাকাশযান, যা ফিরছিল এক ঐতিহাসিক মিশন শেষ করে।

আর্টেমিস-২ মিশন ছিল নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রামের প্রথম মানববাহী চন্দ্র ফ্লাইবাই। এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল চাঁদের কক্ষপথে মানুষকে নিয়ে গিয়ে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতের চন্দ্র অবতরণের প্রযুক্তিগত ভিত্তি পরীক্ষা করা। দীর্ঘ বিরতির পর এটি ছিল মানব মহাকাশ অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রাগুলোর একটি।

মিশনের দশম দিন ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়। আগের নয় দিন কেটেছিল তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিবেশে—চাঁদের কক্ষপথে ভেসে থাকা, পৃথিবীকে দূরের নীল বিন্দু হিসেবে দেখা এবং মহাকাশের গভীর নীরবতা অনুভব করা। কিন্তু শেষ ধাপ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ, যা মহাকাশ অভিযানের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ হিসেবে বিবেচিত।

ওরিয়ন যখন ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন ঘর্ষণের ফলে সৃষ্টি হয় আয়নিত গ্যাসের স্তর বা প্লাজমা শেল। এতে ক্যাপসুলের চারপাশে আগুনের মতো আবরণ তৈরি হয় এবং তাপমাত্রা পৌঁছে যায় প্রায় ২,৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এই ভয়াবহ তাপ সূর্যের পৃষ্ঠের প্রায় অর্ধেকের সমান, যেখানে সাধারণ কোনো ধাতু টিকে থাকতে পারে না—শুধুমাত্র বিশেষ হিট-শিল্ড প্রযুক্তিই এটি সহ্য করতে সক্ষম।

ক্যাপসুলের ভেতরে ছিলেন চারজন নভোচারী—মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর প্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। তারা ছিলেন দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির ফল, যারা মহাকাশের চরম পরিবেশেও শান্তভাবে মিশন পরিচালনা করছিলেন। বাইরের আগুনের ঝড়ের বিপরীতে ভেতরে ছিল নিয়ন্ত্রিত চাপ, অক্সিজেন এবং তাপমাত্রার এক ছোট মানবজগত।

এই সময়ের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত ছিল প্রায় ছয় মিনিটের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। প্লাজমা স্তর রেডিও তরঙ্গ প্রতিফলিত করায় পৃথিবীর সঙ্গে সব সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোল সম্পূর্ণ নীরব হয়ে পড়ে। এই সময়টিকে নাসা “সিক্স মিনিটস অব টেরর” বলে অভিহিত করে, কারণ তখন একমাত্র প্রশ্ন থাকে—হিট শিল্ড অক্ষত আছে কি না।

এই মিশনের পেছনে ছিল আগের অভিজ্ঞতার শিক্ষা। ২০২২ সালের আর্টেমিস-১ মিশনে হিট শিল্ডে কিছু ক্ষয়ের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এবার পুনঃপ্রবেশের কোণ ও প্রোফাইল পরিবর্তন করা হয়, যাতে তাপ ও চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং ঝুঁকি কমে।

অবশেষে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত আসে, যখন নীরবতা ভেঙে ভেসে ওঠে একটি বার্তা—“হিউস্টন, আমরা আপনাদের পরিষ্কারভাবে শুনতে পাচ্ছি।” এই একটিমাত্র বাক্যই ছিল পুরো মিশনের সফলতার প্রথম নিশ্চিত ঘোষণা। মিশন কন্ট্রোলে তখন স্বস্তির ঢেউ নেমে আসে।

এরপর শুরু হয় অবতরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—প্যারাস্যুট সিস্টেম। মোট ১১টি প্যারাস্যুট ধাপে ধাপে খুলে দেয় গতি নিয়ন্ত্রণের পথ। প্রথমে গতি কমে ৩২৫ মাইল, তারপর ১৩০ মাইল এবং শেষ পর্যায়ে প্রায় ১৭ মাইল প্রতি ঘণ্টায় নেমে আসে। আকাশে তখন বিশাল সাদা ছাতার মতো ভেসে থাকে প্যারাস্যুটগুলো।

অবশেষে আসে ঐতিহাসিক মুহূর্ত—প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ। স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৭ মিনিটে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলের কাছে ওরিয়ন নিরাপদে পানিতে অবতরণ করে। পানির সঙ্গে সংঘর্ষে বিশাল জলরাশি কিছুক্ষণের জন্য আকাশে উঠে আবার শান্ত হয়ে যায়। এরপর ইউএসএস জন পি মার্থা জাহাজ থেকে উদ্ধার দল দ্রুত সেখানে পৌঁছে ক্রুদের নিরাপদে উদ্ধার করে।

নাসার প্রশাসক জারেড আইজ্যাকম্যান বলেন, এই নভোচারীরা ছিলেন মানবজাতির পক্ষ থেকে তারাদের কাছে পাঠানো দূত। তিনি আরও জানান, এটি কোনো শেষ নয়, বরং নতুন যুগের শুরু—যেখানে নিয়মিত চন্দ্র মিশন এবং ভবিষ্যতে চাঁদে ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

মোট যাত্রাপথ ছিল প্রায় ১১ লাখ কিলোমিটারেরও বেশি, যা অ্যাপোলো-১৩ মিশনের দূরত্বকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই অভিযানে লাইফ সাপোর্ট, রেডিয়েশন ডিটেকশন, নেভিগেশন সিস্টেম এবং স্পেসস্যুটসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি পরীক্ষা করা হয়, যা ভবিষ্যতের মিশনের ভিত্তি শক্তিশালী করবে।

ক্রুদের দৈনন্দিন জীবন ছিল অত্যন্ত সীমিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত—শূন্য মাধ্যাকর্ষণে ভাসমান জীবন, নির্দিষ্ট খাদ্য তালিকা এবং সীমিত জায়গায় বসবাস। তবুও তারা মিশনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন সফলভাবে।

সব মিলিয়ে আর্টেমিস-২ মিশন শুধু একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়, বরং মানব ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। এটি প্রমাণ করেছে যে মানুষ আবার গভীর মহাকাশে যেতে পারে, নিরাপদে ফিরে আসতে পারে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় অভিযানের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরানের সঙ্গে আমিরাতের শক্তির কোনো তুলনা হয় না

1

পরিবহনের নতুন ভাড়া নির্ধারণে আজ সিদ্ধান্ত

2

২০২৬ বিশ্বকাপে ইরান ইস্যুতে অবস্থান নরম করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্

3

৫ বিভাগে বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস

4

‘আমি বিসিবির বৈধ সভাপতি’

5

দক্ষতা উন্নয়নে নজর কম, ফ্রিল্যান্সার তৈরির হিড়িক

6

পাকিস্তানের ফার্স্ট লেডি বিবি আসিফা কি নির্দেশ করলেন

7

ফাইল না দেওয়ায় অফিস সহায়ককে পুলিশে দিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল

8

হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’ জোন ঘোষণা

9

জনগণের চাহিদায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: রিজভী

10

বিয়ে করছেন সাদিক কায়েম, জানা গেল পাত্রীর পরিচয়

11

যুদ্ধ বন্ধে আশাবাদী ট্রাম্প, অপেক্ষা ইরানের জবাবের

12

প্রতিবন্ধীদের বাস-ট্রেন-লঞ্চে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের উদ্যোগ

13

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্রতর

14

ফুয়েল পাস চালু আরও ৬ জেলায়

15

ইরানের খার্গ দ্বীপের কাছে সাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

16

হরমুজ দিয়ে সামরিক জাহাজ চলাচল নয়, সতর্ক করল ইরান

17

সাবেক মন্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেন আর নেই

18

ইরান যুদ্ধে ২৮০ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের

19

‘‌জাতীয় সংসদই হোক সবপ্রকার সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু’

20