অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৬ এএম
অনলাইন সংস্করণ

নির্জনবাসের পর কেন শিক্ষকতায় ফিরেছিলেন ইমাম গাজালি

নির্জন সাধনা ছেড়ে ইমাম গাজালি কেন শিক্ষকতায় ফিরে এলেন?

বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসা ছিল তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রসিদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র। সেই বিদ্যাপীঠের প্রধান অধ্যাপকদের একজন ছিলেন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ আল-গাজালি। অগাধ পাণ্ডিত্য, রাজদরবারে প্রভাব, অসংখ্য শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধা—সবই ছিল তাঁর অর্জনের অংশ। কিন্তু জীবনের এই সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও তিনি গভীর আত্মিক সংকটে পড়েন।

নিজের নিয়ত ও কাজের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন তিনি। জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাদানের পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টির পাশাপাশি খ্যাতি, সম্মান ও পদমর্যাদার আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে কি না, তা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। ৪৮৮ হিজরিতে তিনি বাগদাদ ছেড়ে আত্মশুদ্ধির পথে যাত্রা করেন।

এরপর দামেস্ক, জেরুজালেম ও মক্কাসহ বিভিন্ন পবিত্র স্থানে ইবাদত, নির্জনতা ও আত্মসমালোচনায় সময় কাটান। প্রায় এক দশক ধরে চলা এই অধ্যায় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, যিনি দুনিয়ার কোলাহল ছেড়ে নির্জন সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন, তিনি কেন আবার শিক্ষকতার জগতে ফিরে এলেন?

ইমাম গাজালির আত্মজীবনীমূলক রচনা আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল—বাংলায় যার অর্থ ‘বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি’—তাঁর এই আত্মিক সংকট ও প্রত্যাবর্তনের কারণ বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়।

মানুষের অন্তরই আত্মশুদ্ধির মূল ক্ষেত্র

ইমাম গাজালির চিন্তায় মানুষের অন্তর ছিল আত্মিক জীবনের কেন্দ্র। তাঁর কাছে অন্তর বলতে কেবল দেহের একটি অঙ্গ বোঝায় না; বরং মানুষের সেই আত্মিক সত্তাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে সে আল্লাহকে চিনতে ও নিজের অবস্থার মূল্যায়ন করতে পারে।

আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল-এ তিনি অন্তরের সুস্থতা ও অসুস্থতার সঙ্গে দেহের সুস্থতা ও অসুস্থতার তুলনা করেছেন। দেহের রোগ যেমন মানুষের শক্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করে, তেমনি অন্তরের রোগও মানুষের আত্মিক উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর কাছে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য জানা কিংবা বিতর্কে জয়ী হওয়া ছিল না। জ্ঞানের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে তা মানুষের চরিত্র, নিয়ত ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে কতটা পরিবর্তন করে, তার ওপর।

নবীগণ অন্তরের ব্যাধির চিকিৎসক

ইমাম গাজালির মতে, মানুষের বুদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বুদ্ধি সত্য অনুসন্ধানে সাহায্য করে, কিন্তু সব আত্মিক সত্যকে এককভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। নবুওয়তের সত্যতা স্বীকার করা এবং তার নির্দেশনা অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর বক্তব্যের মর্ম হলো, নবীগণ মানুষের অন্তরের ব্যাধি নিরাময়ের পথ দেখান। এ ক্ষেত্রে তিনি পথপ্রদর্শকের ওপর নির্ভরশীল দৃষ্টিহীন মানুষের কিংবা চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া রোগীর উপমা ব্যবহার করেছেন।

এই চিন্তা তাঁর আত্মশুদ্ধির ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। নিজের অন্তরকে সংশোধন করা এবং সেই সংশোধনের আলোকে জীবন পরিচালনা করাই হয়ে উঠেছিল তাঁর সাধনার অন্যতম লক্ষ্য।

সমাজের সংকট তাঁকে নতুন করে ভাবিয়েছিল

নিজের আত্মিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি সমাজের অবস্থাও ইমাম গাজালিকে ভাবিয়ে তুলেছিল। আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল-এ তিনি তাঁর সময়ের ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন চিন্তাধারা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্ক এবং কিছু আলেমের আচরণ সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুশীলনে কীভাবে প্রভাব ফেলছিল, তা তিনি তুলে ধরেন।

তাঁর আলোচনায় প্রধানত চার ধরনের প্রবণতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে:

১. দার্শনিকদের কিছু মতবাদ ও সংশয়, যেগুলোকে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য সমস্যাজনক মনে করতেন।

২. এমন কিছু সুফি প্রবণতা, যেগুলো তাঁর বিবেচনায় ধর্মীয় বিধিবিধানের সীমা অতিক্রম করছিল।

৩. বাতেনি বা ইসমাইলি চিন্তাধারার কিছু ব্যাখ্যা, যেগুলোর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ ছিল।

৪. কিছু আলেমের নৈতিক বিচ্যুতি এবং জ্ঞান ও আচরণের মধ্যে অসংগতি।

এগুলো ছিল ইমাম গাজালির নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মতাত্ত্বিক মূল্যায়ন। তাঁর সময়ের সব দার্শনিক, সুফি কিংবা আলেমকে একইভাবে বিচার করা সমীচীন হবে না।

আলেমদের আচরণে সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট

ইমাম গাজালি তাঁর রচনায় এমন মানুষের কথাও তুলে ধরেছেন, যারা আলেমদের অনৈতিক আচরণ দেখে ধর্মীয় বিধান পালনের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলত।

তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, কেউ কেউ বলত—ধর্মীয় বিধান যদি সত্যিই এত গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে আলেমদেরই সেগুলো পালনে সবচেয়ে বেশি যত্নবান হওয়ার কথা। অথচ তাঁদের মধ্যে কেউ নামাজে অবহেলা করেন, কেউ মদ পান করেন, কেউ এতিমের সম্পদ বা ওয়াক্‌ফের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেন, আবার কেউ হারাম উপার্জন কিংবা ঘুষের সঙ্গে জড়িত থাকেন—এমন অভিযোগও মানুষের মুখে শোনা যেত।

এ ধরনের আচরণ নিয়ে গাজালির উদ্বেগ ছিল গভীর। কারণ, যাঁরা অন্যকে নৈতিকতার শিক্ষা দেন, তাঁদের জীবনেই যদি সেই শিক্ষার প্রতিফলন না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এখানে তাঁর উপলব্ধি ছিল গুরুত্বপূর্ণ: শুধু তর্ক বা উপদেশ দিয়ে মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা কঠিন, যদি উপদেশদাতার নিজের জীবনেও সেই শিক্ষার প্রতিফলন না থাকে।

নির্জনবাসে থাকাই কি যথেষ্ট ছিল?

সমাজের এই অবস্থার মুখোমুখি হয়ে ইমাম গাজালি নিজের নির্জনবাসের উদ্দেশ্য নিয়েও নতুন করে ভাবেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বিবরণে এমন একটি আত্মসমালোচনার সুর পাওয়া যায়—যখন সমাজে নৈতিক ও ধর্মীয় সংকট গভীর, তখন একজন জ্ঞানী ব্যক্তি কেবল নিজের মুক্তি ও আত্মিক প্রশান্তি নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন কি না।

এই উপলব্ধি তাঁর প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে তাঁর রচনা থেকে বোঝা যায়।

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, আত্মশুদ্ধি মানে শুধু মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। নিজের নিয়ত সংশোধনের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে মানুষের কাছে ফিরে গিয়ে জ্ঞান বিতরণ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করাও দায়িত্বের অংশ হতে পারে।

কেন আবার শিক্ষকতায় ফিরলেন?

ইমাম গাজালি প্রথমে জনজীবনে ফেরার বিষয়ে দ্বিধায় ছিলেন। সমাজের বিরূপ পরিবেশ, মানুষের সমালোচনা এবং নিজের আত্মিক অবস্থার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল।

এ সময় সেলজুক শাসনামলের প্রভাবশালী উজির ফখরুল মুলকের উদ্যোগে নিশাপুরের নিজামিয়া মাদ্রাসায় তাঁর শিক্ষকতায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এই প্রত্যাবর্তনকে শুধু রাষ্ট্রীয় নির্দেশের ফল হিসেবে দেখলে তাঁর নিজের আত্মিক উপলব্ধির গুরুত্ব উপেক্ষিত হবে।

তাঁর রচনা থেকে বোঝা যায়, তিনি জনজীবনে ফিরে আসার পক্ষে আত্মিক ও সামাজিক কারণ খুঁজে পেয়েছিলেন। নির্জন সাধনায় অর্জিত উপলব্ধিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন তিনি।

তাঁর কাছে এটি আগের জীবনে নিছক ফিরে যাওয়া ছিল না; বরং জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্য ও নিয়তকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার প্রচেষ্টা ছিল।

আগের শিক্ষকতা আর নতুন জীবনের পার্থক্য

ইমাম গাজালি আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল-এ তাঁর প্রত্যাবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আগের ও পরের জীবনের উদ্দেশ্যের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, আগে তিনি এমন জ্ঞান প্রচারে যুক্ত ছিলেন, যার সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা ও পদমর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে ছিল। পরে তিনি এমন জ্ঞানের দিকে মানুষকে আহ্বান করতে চেয়েছিলেন, যা জাগতিক সম্মানের মোহ কমিয়ে আত্মিক উন্নতির পথ দেখায়।

অর্থাৎ, বাহ্যিকভাবে শিক্ষকতার কাজে ফিরে এলেও তাঁর কাছে কাজটির অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য বদলে গিয়েছিল। তিনি আর শুধু পাণ্ডিত্য প্রদর্শন কিংবা সম্মান অর্জনকে লক্ষ্য হিসেবে দেখতে চাননি; বরং জ্ঞানকে আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

এই পরিবর্তনই তাঁর প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

ইমাম গাজালির জীবন থেকে কী শেখা যায়?

ইমাম গাজালির জীবনের এই অধ্যায় আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে।

প্রথমত, জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নিজের নিয়ত ও আচরণ পরীক্ষা করাও জরুরি। মানুষ অনেক কিছু জানলেও সেই জ্ঞান যদি তার চরিত্রে পরিবর্তন না আনে, তবে জ্ঞানের উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়।

দ্বিতীয়ত, আত্মশুদ্ধি ব্যক্তিগত প্রশান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের সংশোধনের পর সেই উপলব্ধিকে পরিবার, সমাজ ও বৃহত্তর মানবকল্যাণে কাজে লাগানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।

তৃতীয়ত, সমাজের নৈতিক সংকটের সমালোচনা করার আগে নিজের জীবনকে সেই সমালোচনার মানদণ্ডে যাচাই করা প্রয়োজন। উপদেশের সঙ্গে আচরণের সামঞ্জস্য মানুষের আস্থা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

সবশেষে, নির্জনতা ও জনসম্পৃক্ততা সব সময় পরস্পরের বিপরীত নয়। জীবনের এক পর্যায়ে নির্জন সাধনা আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে, আবার অন্য পর্যায়ে মানুষের মধ্যে ফিরে গিয়ে দায়িত্ব পালন করাও সেই সাধনারই বাস্তব প্রকাশ হতে পারে।

ইমাম গাজালির প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য এখানেই—তিনি শিক্ষকতায় ফিরেছিলেন, কিন্তু নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, আগের মতো একই উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। তাঁর অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃত আত্মশুদ্ধির একটি বড় পরীক্ষা হলো সেই উপলব্ধি মানুষের জীবন ও সমাজের কল্যাণে কতটা কাজে লাগে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিসিবির সভাপতি হয়ে যে প্রতিশ্রুতি দিলেন তামিম

1

রোমাঞ্চকর বিশ্বকাপে এবার খেলবেন সাত জোড়া ভাই

2

ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিবাদ সংসদে

3

রাম চরণের ‘পেদ্দি’ মুক্তি পাচ্ছে ৪ জুন

4

১ হাজার মাদরাসায় চালু হচ্ছে কারিগরি কোর্স : শিক্ষামন্ত্রী

5

ইতিহাস গড়ে বিশ্বকাপের নকআউটে আইভরিকোস্ট

6

এভারেস্টে নতুন ইতিহাস গড়লেন দুই নেপালি পর্বতারোহী

7

সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আশিক রুবাইয়াতের পদত্যাগ

8

বৈদেশিক বাজারে ভারতীয় রুপির রেকর্ড দরপতন

9

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের দাবি নাকচ করল ইরান

10

শিক্ষার্থী আত্মহত্যায় ঢাবি শিক্ষক কারাগারে

11

নেইমার কত মিনিট খেলবেন আজ, জানালেন আনচেলত্তি

12

মার্টিনেল্লির গোলে শেষ ষোলোয় ব্রাজিল

13

নেত্রকোনায় জামায়াতের এমপির গাড়ি ভাঙচুর

14

জিম্বাবুয়েতে ওয়ানডেতে ৮২৩ রানের টার্গেট

15

ব্রাজিল ম্যাচের আগে জাপানকে বড় দুঃসংবাদ দিলেন ‘মেসি’

16

আমার বুক ফেটে যাচ্ছে, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে: মেসি

17

বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ, এবার নতুন মিশনে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা

18

পর্তুগালকে রুখে দিলো কঙ্গো, ১-১ গোলে ড্র

19

মাছ কম, তবু ঠাকুরগাঁওয়ের বুড়ির বাঁধে উৎসবের কমতি নেই

20