দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রবাসী এবং দেশে বসবাসকারী সব বাংলাদেশিকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করা গেলে দেশে ও বিদেশে থাকা সব নাগরিকই এর সুফল ভোগ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জন্য ভালো কিছু করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। মানুষ দেশে কিংবা বিদেশে যে অবস্থানেই থাকুক না কেন, তার কাজের মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষের উপকার হলে সেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
জাপানের টোকিওর নিউ ওতানি হোটেলে সন্ধ্যায় জাপানপ্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় প্রবাসীরা বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, জাপানি, জার্মান, ফরাসিসহ কয়েকটি বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী একটি ভাষা বেছে নিতে পারবে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, আগামী বছর থেকে স্কুলগুলোতে জাপানিসহ কয়েকটি বিদেশি ভাষা শেখানোর কার্যক্রম চালুর প্রত্যাশা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা, শিল্পকলা ও সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে চায় সরকার। পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তাঁর মতে, বিদেশি ভাষায় দক্ষতার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পারদর্শী হওয়ার সুযোগ পেলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বাড়তি সুবিধা পাবে।
স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে জাপানের সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশুরা যাতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ৫০টি করে শয্যা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এসব হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ১৫০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধা চালু এবং শিশু ও নারীদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, উপজেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো গেলে গ্রামের মানুষকে চিকিৎসার জন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরে ছুটতে হবে না। একই সঙ্গে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়া সহজ হবে।
রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়াতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অন্তত ৮০ শতাংশ নারী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন, পুষ্টি এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করবেন।
তিনি বলেন, মানুষকে সুস্থ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করা গেলে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব হবে। এতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে।
জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের ভাষাগত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা জরুরি।
তিনি জানান, জাপানে কর্মী পাঠানোর আগে তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, জাপানি ভাষা শিক্ষা এবং দেশটির সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাপানি ভাষায় দক্ষ প্রবাসীদের দেশে কাজে লাগানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও আগ্রহী হতে হবে। জাপানি ভাষার শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও প্রত্যাশার তুলনায় কম আবেদন পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, জাপানি ভাষায় দক্ষ প্রবাসীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় অথবা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশে অবস্থান করলেও তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক এবং দেশের উন্নয়নে প্রত্যেকেরই ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জনশক্তির দক্ষতা বাড়াতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান।
জাপান বিএনপির সভাপতি মীর রেজাউল করিম রেজার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় দলটির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন