সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, কিন্তু দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও গর্ভধারণ হচ্ছে না—এমন পরিস্থিতিতে অনেক দম্পতি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আমাদের সমাজে বন্ধ্যত্বের জন্য প্রায়ই নারীদের দায়ী করা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এ সমস্যার পেছনে পুরুষেরও ভূমিকা থাকতে পারে। শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া, চলাচল ও গঠনগত সমস্যা থেকে শুরু করে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা প্রজননতন্ত্রের জটিলতা—বিভিন্ন কারণে পুরুষের সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, নিয়মিত ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছাড়া যৌনসম্পর্কের পরও ১২ মাসের মধ্যে গর্ভধারণ না হলে সেই অবস্থাকে বন্ধ্যত্ব বলা হয়। এর কারণ নারী, পুরুষ কিংবা উভয়ের হতে পারে। ইউরোপীয় ইউরোলজি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ্যত্বের সমস্যায় থাকা প্রায় অর্ধেক দম্পতির ক্ষেত্রে পুরুষের কোনো না কোনো প্রজননগত কারণ শনাক্ত করা যায়।
পুরুষের প্রজননক্ষমতা মূলত শুক্রাণু উৎপাদন, শুক্রাণুর গুণগত মান এবং বীর্যের মাধ্যমে শুক্রাণু নারীর প্রজননতন্ত্রে পৌঁছানোর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। শুক্রাণুর সংখ্যা খুব কম হলে, চলাচলের ক্ষমতা কমে গেলে কিংবা গঠনগত ত্রুটি থাকলে স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণে সমস্যা হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে অণ্ডকোষে শুক্রাণু তৈরি হলেও প্রজননতন্ত্রের নালিতে বাধা থাকায় তা বীর্যের সঙ্গে বাইরে আসতে পারে না। আবার কারও বীর্যে একেবারেই শুক্রাণু পাওয়া যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে অ্যাজোস্পার্মিয়া বলা হয়।
পুরুষের বন্ধ্যত্বের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো—
১. শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া: বীর্যে শুক্রাণুর পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকলে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা কমতে পারে।
২. শুক্রাণুর গতিশীলতা ও গঠনগত সমস্যা: শুক্রাণু যথেষ্ট ভালোভাবে চলাচল করতে না পারলে ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়। একইভাবে শুক্রাণুর গঠনগত ত্রুটিও প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
৩. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: টেস্টোস্টেরনসহ প্রজননের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন হরমোনের ঘাটতি বা অস্বাভাবিকতা শুক্রাণু উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
৪. অণ্ডকোষের সমস্যা: অণ্ডকোষে আঘাত, সংক্রমণ, টিউমার কিংবা জন্মগত ত্রুটির কারণে শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। শৈশবে অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে থেকে যাওয়ার সমস্যাও পরবর্তী সময়ে প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. ভেরিকোসিল: অণ্ডকোষের চারপাশের শিরা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়াকে ভেরিকোসিল বলা হয়। এতে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা ও স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে শুক্রাণুর গুণগত মান কমতে পারে।
৬. সংক্রমণ: মাম্পসের কারণে অণ্ডকোষে প্রদাহ, যৌনবাহিত সংক্রমণ এবং প্রজননতন্ত্রের অন্যান্য সংক্রমণ শুক্রাণু উৎপাদন বা চলাচলে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
৭. শুক্রাণু চলাচলের নালিতে বাধা: সংক্রমণ, অস্ত্রোপচার, আঘাত কিংবা জন্মগত সমস্যার কারণে শুক্রাণু বহনকারী নালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
৮. জিনগত কারণ: কিছু বংশগত বা ক্রোমোজোমজনিত সমস্যা অণ্ডকোষে শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে।
৯. জীবনযাপনের অভ্যাস: ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, মাদক গ্রহণ, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
১০. ক্যানসারের চিকিৎসা ও কিছু ওষুধ: কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ শুক্রাণু উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করা উচিত নয়। বাইরে থেকে নেওয়া টেস্টোস্টেরন শরীরের স্বাভাবিক শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে।
তবে সব ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বের নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। জিনগত, হরমোনজনিত, পরিবেশগত ও অন্যান্য কারণও এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।
পুরুষের বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে সব সময় শারীরিক কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। অনেক পুরুষের যৌনক্ষমতা স্বাভাবিক থাকলেও শুক্রাণুর সংখ্যা বা গুণগত মানে সমস্যা থাকতে পারে। তাই শুধু যৌনক্ষমতা কিংবা বীর্যের পরিমাণ দেখে প্রজননক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
সমস্যা শনাক্ত করতে চিকিৎসকেরা সাধারণত কয়েকটি পরীক্ষা করিয়ে থাকেন।
বীর্য পরীক্ষা: শুক্রাণুর সংখ্যা, ঘনত্ব, গতিশীলতা, গঠন এবং বীর্যের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা হয়।
হরমোন পরীক্ষা: প্রয়োজন অনুযায়ী টেস্টোস্টেরন, এফএসএইচ, এলএইচসহ বিভিন্ন হরমোনের মাত্রা দেখা হয়।
শারীরিক পরীক্ষা: অণ্ডকোষের আকার, গঠন, ভেরিকোসিল কিংবা অন্য কোনো সমস্যা আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়।
আলট্রাসনোগ্রাফি: প্রয়োজন অনুযায়ী অণ্ডকোষ ও প্রজননতন্ত্রের নির্দিষ্ট অংশের পরীক্ষা করা হতে পারে।
জিনগত পরীক্ষা: শুক্রাণুর সংখ্যা অত্যন্ত কম হলে কিংবা বীর্যে শুক্রাণু না পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে জিনগত পরীক্ষা করা হয়।
বীর্য পরীক্ষায় অস্বাভাবিক ফল পাওয়া গেলেই স্থায়ী বন্ধ্যত্ব নিশ্চিত হয় না। ডব্লিউএইচওর ২০২৫ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, বীর্যের এক বা একাধিক বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক সীমার বাইরে থাকলে সাধারণত অন্তত ১১ সপ্তাহ পর পুনরায় পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে বীর্যের সব বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক থাকলে নিয়মিতভাবে দ্বিতীয় পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসক রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন।
পুরুষের বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা নির্ভর করে সমস্যার কারণের ওপর। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ, অস্ত্রোপচার কিংবা সহায়ক প্রজননপ্রযুক্তির মাধ্যমে সন্তান ধারণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
১. হরমোনের চিকিৎসা: হরমোনের ঘাটতি বা ভারসাম্যহীনতার কারণে শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত হলে নির্দিষ্ট চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে সব ধরনের বন্ধ্যত্বে হরমোনের ওষুধ কার্যকর নয়।
২. অস্ত্রোপচার: ভেরিকোসিল বা শুক্রাণু চলাচলের নালিতে বাধার মতো নির্দিষ্ট সমস্যা থাকলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
৩. সংক্রমণের চিকিৎসা: প্রজননতন্ত্রে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হয়।
৪. আইইউআই: এ পদ্ধতিতে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা শুক্রাণু সরাসরি নারীর জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়। শুক্রাণুর সংখ্যা ও গতিশীলতার সমস্যা তুলনামূলক কম হলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়।
৫. আইভিএফ: নারীর ডিম্বাণু ও পুরুষের শুক্রাণু শরীরের বাইরে পরীক্ষাগারে নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। পরে সেই ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
৬. ইকসি: শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতিশীলতায় গুরুতর সমস্যা থাকলে কিংবা নির্দিষ্ট কারণে স্বাভাবিক নিষেক সম্ভব না হলে একটি শুক্রাণু সরাসরি ডিম্বাণুর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। একে ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন বা ইকসি বলা হয়।
বীর্যে শুক্রাণু না পাওয়া গেলেও সব ক্ষেত্রে চিকিৎসার সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ বা শুক্রাণু বহনকারী অংশ থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শুক্রাণু সংগ্রহ করে আইভিএফ-ইকসি পদ্ধতিতে সন্তান ধারণের চেষ্টা করা সম্ভব। তবে এটি নির্ভর করে সমস্যার ধরন ও অণ্ডকোষে শুক্রাণু উৎপাদনের অবস্থার ওপর।
চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।
ধূমপান ও মাদক গ্রহণ বন্ধ করা।
অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলা।
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
নিয়মিত হাঁটাচলা ও শারীরিক ব্যায়াম করা।
পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।
শাকসবজি, ফলমূল ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া।
অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের ঝুঁকি যথাসম্ভব কমানো।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হরমোন বা শুক্রাণু বাড়ানোর ওষুধ গ্রহণ না করা।
এসব অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে জীবনযাপনে পরিবর্তন করলেই বন্ধ্যত্বের সব কারণ দূর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছাড়া যৌনসম্পর্কের পরও এক বছর সন্তান ধারণ সম্ভব না হলে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নারীর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে ছয় মাস চেষ্টা করার পরই মূল্যায়ন শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আগে থেকেই অণ্ডকোষের সমস্যা, যৌনবাহিত সংক্রমণ, ক্যানসারের চিকিৎসা কিংবা প্রজননক্ষমতা-সংক্রান্ত কোনো জটিলতা থাকলে আরও আগেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।
আমেরিকান ইউরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ও আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিনের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বন্ধ্যত্বের কারণ অনুসন্ধানে স্বামী-স্ত্রী দুজনের পরীক্ষা একই সময়ে করা উচিত। কারণ, সমস্যাটি শুধু পুরুষ বা নারীর নয়, উভয়ের কারণেও হতে পারে।
বন্ধ্যত্ব কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা হতে পারে। তাই সামাজিক সংকোচ বা লজ্জা এড়িয়ে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং দুজনেরই পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন