জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও এর মালিক রুপার্ট মারডকের বিরুদ্ধে করা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১০ বিলিয়ন ডলারের মানহানির মামলা খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির ফেডারেল আদালত। মামলায় সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প—এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত।
স্থানীয় সময় শনিবার (৩১ অক্টোবর) মায়ামির ফেডারেল আদালতের জেলা বিচারক ড্যারিন গেইলস মামলাটি with prejudice খারিজ করেন। অর্থাৎ, একই অভিযোগে সংশোধিত আবেদন দিয়ে আবার মামলা করার সুযোগ থাকছে না। বিচারকের মতে, জনপরিচিত ব্যক্তি হিসেবে মানহানির মামলা প্রমাণে প্রয়োজনীয় ‘প্রকৃত অসৎ উদ্দেশ্য’ (অ্যাকচুয়াল ম্যালিস) প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি ট্রাম্প। খবর রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও আল জাজিরার।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কোনো জনপরিচিত ব্যক্তি মানহানির মামলা করলে তাঁকে প্রমাণ করতে হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি বক্তব্যটি মিথ্যা জেনেও প্রকাশ করেছেন অথবা সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বেপরোয়া অবহেলা করেছেন। আইনি পরিভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যাকচুয়াল ম্যালিস’।
বিচারক গেইলস তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, ট্রাম্পের সংশোধিত অভিযোগপত্রে এই শর্ত পূরণের মতো যথেষ্ট তথ্য নেই। অভিযোগগুলো অস্পষ্ট, প্রমাণহীন এবং কখনো কখনো ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
মামলার দুর্বলতা তুলে ধরে বিচারক বলেন, সংবাদমাধ্যমটির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ত্রুটি দেখাতে ট্রাম্পের আইনজীবীরা কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন দুর্বলতা তৈরির চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষায়, সংশোধিত অভিযোগপত্রে ট্রাম্পের পক্ষ ‘খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে’।
বিচারক আরও উল্লেখ করেন, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বক্তব্য ও অস্বীকৃতির বিষয়টি উপেক্ষা করেনি। বরং তিনি চিঠিটি জাল বলে দাবি করেছেন এবং সেটি লেখার কথা অস্বীকার করেছেন—এ তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছিল।
২০২৫ সালের ১৭ জুলাই ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ২০০৩ সালে জেফরি এপস্টেইনের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছাবার্তার একটি সংকলন তৈরি করা হয়েছিল। সেই সংকলনে ট্রাম্পের নামে একটি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ব্রিটিশ সমাজকর্মী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল শুভেচ্ছাবার্তাগুলো সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানায় সংবাদমাধ্যমটি। এপস্টেইনের যৌন পাচারচক্রে জড়িত থাকার দায়ে বর্তমানে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের নামে থাকা চিঠিতে টাইপ করা লেখার চারপাশে হাতে আঁকা এক নারীর শরীরের অবয়ব ছিল। ছবিটির নিচে নারীর শ্রোণি অঞ্চলের কাছাকাছি স্থানে ট্রাম্পের স্বাক্ষরও ছিল বলে দাবি করা হয়।
তবে চিঠির লেখা, স্বাক্ষর ও ছবি আঁকার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেন ট্রাম্প। পরে প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির মাধ্যমে জন্মদিনের সংকলন থেকে চিঠিটির একটি অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। প্রতিবেদনটিকে ‘মিথ্যা, বিদ্বেষপূর্ণ ও মানহানিকর’ বলে অভিহিত করেন তিনি।
২০২৫ সালের ১৮ জুলাই মায়ামির ফেডারেল আদালতে মামলাটি করেন ট্রাম্প। এতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, এর মালিক রুপার্ট মারডক, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমটির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জেনেশুনে ও বেপরোয়াভাবে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়।
ওই প্রতিবেদনের কারণে তাঁর আর্থিক ও সুনামের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলেও মামলায় দাবি করেন ট্রাম্প।
এর আগে গত এপ্রিলে বিচারক গেইলস ট্রাম্পের মানহানির মামলাটি খারিজ করেছিলেন। তবে তখন তিনি নতুন করে অভিযোগপত্র দাখিলের সুযোগ দিয়েছিলেন।
মে মাসে সংশোধিত অভিযোগপত্র জমা দেন ট্রাম্পের আইনজীবীরা। সেখানে বলা হয়, চিঠিটি কীভাবে সাংবাদিকদের হাতে পৌঁছেছিল এবং এর সত্যতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ না করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বেপরোয়া আচরণ করেছে।
তবে নতুন অভিযোগপত্রেও ‘প্রকৃত অসৎ উদ্দেশ্য’ প্রমাণের মতো যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে মনে করেন বিচারক। ফলে এবার মামলাটি with prejudice খারিজ করা হয়েছে। এতে একই অভিযোগে নিম্ন আদালতে নতুন করে মামলা করার সুযোগ বন্ধ হয়েছে। তবে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সম্ভাবনা রয়েছে।
জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের ধরন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। দুজনকে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দেখা গেছে। রাজনীতি, শিক্ষাঙ্গন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল এপস্টেইনের।
২০২৫ সালে ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর মার-আ-লাগো রিসোর্ট থেকে নারী কর্মীদের ‘চুরি’ করার কারণে এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন তিনি।
২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় এক অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে প্ররোচিত করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন এপস্টেইন। এ ঘটনায় তিনি ১৩ মাস কারাভোগ করেন। ২০১৯ সালে যৌন পাচারসংক্রান্ত ফেডারেল অভিযোগে বিচার শুরুর আগেই নিউইয়র্কের কারাকক্ষে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করা হয়।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে মামলায় পরাজয়ের পরও সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আইনি লড়াই শেষ হচ্ছে না। বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমসসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে তাঁর করা আরও কিছু মামলা চলমান রয়েছে।
এপস্টেইনসংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে মামলাটি খারিজ হওয়াকে ট্রাম্পের আইনি লড়াইয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কি না, সে বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে।
মন্তব্য করুন