সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রাথমিক তারিখ ঘোষণা করে বিব্রত পরিস্থিতিতে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দিন আগামী ৩০ ডিসেম্বর তৃতীয় ধাপের ইউপি ভোটের তারিখ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দ্বিতীয় ধাপের ভোটের তারিখ ১৩ ডিসেম্বর রয়েছে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা।
এসব বিষয় আমলে না নিয়েই ইউপি ভোটের তারিখ নির্ধারণ করায় নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অবস্থান পরিবর্তন করেছে ইসি। তাই ভোটের তারিখে পরিবর্তন আসার কথা জানিয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠনটি। সোমবার ইসি সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করলে এক দিন পর মঙ্গলবার তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সরকারের দুজন শীর্ষ ব্যক্তি।
সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ না করেই নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণায় ইসির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক মহলেও সরকার ও ইসির সমন্বয়হীনতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে ইসি বলছে, আজ (বৃহস্পতিবার) আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠকে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত হবে।
একাধিক নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার পর সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রী যেভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে বিব্রত কমিশন।
তারা মনে করে, তারিখ নির্ধারণে নিজেদের ভুল ও অদূরদর্শিতা ছিল সত্য। তবে মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রী যেভাবে বক্তব্য দিয়েছেন তা ইসির জন্য সম্মানজনক নয়। ইসি সোমবার অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে সাত ধাপে ইউপি ভোট গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করে।
ইসির ঘোষণা অনুযায়ী, সম্ভাব্য ভোটের তারিখ হচ্ছে প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ ২০২৭ সালের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ও শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ইউপির নির্বাচন ধরা হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপের ভোটের সম্ভাব্য তারিখ ১৩ ডিসেম্বর। অথচ জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৮, ১০, ১৩ ও ১৫ ডিসেম্বর। ১৩ ডিসেম্বর গণিত পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই দিন দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ রাখা হয়েছে।
ইসি ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইউপি নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা হয়। ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে শিক্ষকরা কাজ করেন। পরীক্ষা বহাল রাখা হলে ৮ থেকে ১৫ ডিসেম্বর কোনো ধরনের নির্বাচন আয়োজন করার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে তৃতীয় ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারণ করেছে ইসি। ওই দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এদিন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে সরকারি দল বিএনপি। অথচ ওই দিন তৃতীয় ধাপে ইউপি ভোটের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করেছে ইসি।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনের বিশাল কর্মযজ্ঞ ইসির একার পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের তারিখ বা রোডম্যাপ ঘোষণা করলে সরকার ও ইসির মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি হতো না। যদিও সোমবারের তারিখ ঘোষণা নিয়ে মঙ্গলবার ইসি নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত নয়। বৃহস্পতিবার (আজ) আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠকে এটি চূড়ান্ত হবে।’
মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম আগামী ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখের বিষয়ে সরকার কিছুই জানে না বলে মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শিরোধার্য। তবে এ বিষয়ে পাল্টা মন্তব্য করার ধৃষ্টতা দেখাব না। নো কমেন্টস ফ্রম মাই সাইড।’
সোমবার এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ইসি এবার সাত ধাপে ইউপি ভোট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই দিন কমিশনে এ নিয়ে আলোচনার পর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ইউপি ভোট শুরু করতে পারব। ভোটের তারিখ বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত নয়। আন্তমন্ত্রণালয় সভা আছে বৃহস্পতিবার, সেখানে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।’
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। এখানে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল চূড়ান্ত করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রীতি আছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে ইসি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করার। এ-সংক্রান্ত চিঠিও আদানপ্রদান হয়। তবে ২ আগস্ট ইসির সিনিয়র সচিববরাবর স্থানীয় সরকার বিভাগের (ইউপি শাখা-১) পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিমিত্ত সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ও অন্যান্য তথ্যাদি পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হলো।’
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য, ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে যে আইন রয়েছে তা স্থানীয় সরকার বিভাগের আইন। এ আইনে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন করার ক্ষমতা দেওয়া আছে। নির্বাচন করবে কমিশন। কমিশন শুধু নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এটা কোনো তফসিল বা চূড়ান্ত কিছু নয়। তবে অবশ্যই এ (নির্বাচনের তারিখ) বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা বা কথা বলা দরকার ছিল। কেননা ইউপি নির্বাচন বিশাল কর্মযজ্ঞ।’
এ বিষয়ে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশন সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে-আলোচনা না করেই একজন নির্বাচন কমিশনার কীভাবে তারিখ ঘোষণা করেন? এ ক্ষেত্রে সরকারকে তো সহযোগিতা করতে হবে। তবে আরেকজন নির্বাচন কমিশনার বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন, এখনো তারিখ নির্ধারণ হয়নি। নির্বাচনের অনানুষ্ঠানিক তারিখ বলা হয়েছিল।
২৬ মন্ত্রণালয়-বিভাগের সঙ্গে ইসির বৈঠক আজ : স্থানীয় সরকার এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন সামনে রেখে ২৬ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে আজ বৈঠকে বসছে ইসি। ইসির উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেনের সই করা এ-সংক্রান্ত চিঠি থেকে বিষয়টি জানা গেছে। ইতোমধ্যে চিঠিটি সংশ্লিষ্টদের পাঠানো হয়েছে।
এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ঠাকুরগাঁও-১ শূন্য আসনের নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক সভা বৃহস্পতিবার বেলা ২টা ৩০ মিনিটে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত হবে।’