বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান হয়েছে, এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। তবে রাজনৈতিক পালাবদলের পরও বন্ধ হয়নি সংঘর্ষ, দলীয় কোন্দল ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনা।
গত ১৮ অক্টোবর রাতে নারায়ণগঞ্জের পাইস্কায় কয়েকজন ব্যক্তি ধাওয়া করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালান রিপন মিয়ার ওপর। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। রিপন ছিলেন ক্ষমতাসীন বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদলের স্থানীয় নেতা।
স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় কারা থাকবেন, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। রিপনের মেয়ে শীলা গণমাধ্যমকে জানান, কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর বাবাকে ধাওয়া করে কুপিয়ে হত্যা করেছেন। স্থানীয় বিএনপি সভাপতি ঘটনাটিকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্যের লড়াইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছেন।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের সংঘর্ষে নিহত হন দুই ভাই। পুলিশ জানায়, রমজানে ইফতারের পর একটি তর্কবিতর্ক থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। কয়েক ঘণ্টা পর মারা যান হাফিজুর রহমান। তাঁর ভাই ও স্থানীয় জামায়াত নেতা মফিজুর রহমান ১০ মার্চ ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বিএনপি ও জামায়াত একে অপরকে দায়ী করে। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা দায়েরের পর স্থানীয় এক বিএনপি নেতা এবং দলটির স্বেচ্ছাসেবক শাখার সাবেক এক নেতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনাটি ঘটে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে।
এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান, একাডেমিক গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান বিশ্লেষণ করলে গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সংঘর্ষের পাশাপাশি নিজ দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতাও সরকার পরিবর্তনের পর অব্যাহত থেকেছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৬৭টি ঘটনায় ৯৪ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৫৮৭ জন আহত হয়েছেন।
এর মধ্যে ১১২টি ঘটনা ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ। এসব ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ২১৫ জন আহত হন।
এই পরিসংখ্যানে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচিত সরকারের উভয় সময়ের ঘটনাই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি প্রধান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসান ঘটিয়ে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচিত সরকার।
তবে সরকার পরিবর্তনের পরও স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন পদ-পদবি নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা থামেনি।
২০০২ সাল থেকে রাজনৈতিক সহিংসতার তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দলীয় কোন্দল, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সমস্যা।
একটি দলীয় পদ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জমি কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব বিরোধের পেছনে অনেক সময় একটি এলাকার ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কাজ করেছে।
২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ২৮৪টি ঘটনা নথিবদ্ধ করেছিল আসক। এসব ঘটনায় ৫৫ জন নিহত হন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হন ৩৭ জন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের ২০১৪ সালের গবেষণাপত্র ‘Political Parties in Bangladesh’-এ এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই সময়ে জামায়াতে ইসলামী বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের অংশীদার ছিল। দলটির দুজন নেতা মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন। তবে রাজনৈতিক জোটে থাকা সত্ত্বেও দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বন্ধ হয়নি।
গবেষণায় উদ্ধৃত আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৩৪টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আটজন নিহত হন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে ৪২টি সংঘর্ষে সাতজনের মৃত্যু হয়।
২০০৭ ও ২০০৮ সালে সামরিক বাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ওই দুই বছরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের আটটি ঘটনায় দুজন নিহত হন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের একটি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়, যাতে কেউ নিহত হননি।
প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে ৩২টি সংঘর্ষে সাতজনের মৃত্যু হয়। এসব সংঘর্ষের সবগুলোই ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে।
তবে রাজনৈতিক সংঘর্ষ কমে যাওয়ার অর্থ রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। জরুরি আইনের অধীনে পরিচালিত ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বেআইনি গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নথিবদ্ধ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও সীমিত করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, দলগুলোর সংঘর্ষের সুযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ আবার বাড়তে থাকে।
২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৭৯৯টি ঘটনায় ৯৭ জন নিহত হন। একই সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের সংখ্যা ছিল ২২৯টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারান ২১ জন।
এই পরিসংখ্যানের উদ্দেশ্য কোনো দলকে অন্য দলের তুলনায় ভালো বা খারাপ হিসেবে উপস্থাপন করা নয়। বরং ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও কীভাবে স্থানীয় আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ ঘটতে পারে, তা তুলে ধরা।
স্থানীয় পর্যায়ের সংঘর্ষ নিয়মিত ঘটনা হলেও জাতীয় রাজনৈতিক সংকটের সময় সহিংসতা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
২০১৩ সালে বিতর্কিত নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে। ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫০৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করে আসক।
সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে হরতালকেন্দ্রিক সহিংসতায় ১৮৫ জন এবং ২৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া অবরোধ কর্মসূচিতে আরও ৮৫ জনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জামায়াত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষও ওই বছর ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হয়ে ওঠে।
আসকের মূল বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী, জামায়াত, তাদের ছাত্রসংগঠন শিবির এবং পুলিশের মধ্যকার সংঘর্ষে ৩৭ জন নিহত হন। জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষের পৃথক হিসাবে আরও ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ-জামায়াত-শিবির সংঘর্ষে ১৩ জন, আওয়ামী লীগ-জামায়াত সংঘর্ষে নয়জন, শিবির-পুলিশ সংঘর্ষে নয়জন এবং আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত-পুলিশের মধ্যকার সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন।
সব মিলিয়ে ওই বছর জামায়াত বা শিবির জড়িত সংঘাতের বিভিন্ন শ্রেণিতে ৯৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে এসব শ্রেণিবিন্যাসে সংঘর্ষে অংশ নেওয়া পক্ষগুলোর পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে; নির্দিষ্ট মৃত্যুর জন্য কোন পক্ষ দায়ী, তা নিশ্চিত করা হয়নি।
পরবর্তী বছরগুলোতে জামায়াত ও শিবিরের নাম উল্লেখ থাকা সংঘর্ষের সংখ্যা কমে আসে। ২০১৫ সালে এ ধরনের নয়টি ঘটনায় তিনজন নিহত হন। ২০১৬ সালে দুটি ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালে শিবির-পুলিশ সংঘর্ষের একটি ঘটনায় তিনজন আহত হন। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের তালিকায় জামায়াত বা শিবিরের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিপক্ষ দলের পাশাপাশি একই দলের নেতাকর্মীরাও নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
২০১৭ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫২ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করে আসক। এর মধ্যে শুধু আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষেই ২৯ জন নিহত হন। তবে এই হিসাবে দলটির ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোর সংঘর্ষের পৃথক তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনও রাজনৈতিক সহিংসতার অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৪৭ জন নিহত হন। ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট ১৭৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করে আসক।
২০২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় ১৫৭ জন নিহত হন। এসব ঘটনার মধ্যে ১১৩ জনের মৃত্যু ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘর্ষের কারণে।
এসব পরিসংখ্যান থেকে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী পক্ষকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। তবে এগুলো দেখায়, রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু জাতীয় নির্বাচন বা সংসদীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় পর্যায়ে পদ-পদবি ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে।
রাজনৈতিক সহিংসতার কারণ অনুসন্ধানে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি গবেষণায় ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা হয়।
গবেষণায় ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের ঘটনাগুলোর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দলীয় অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বিস্তারের লড়াই ছিল সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া ঠিকাদারি, জমি, সম্পত্তি ও চাকরিসংক্রান্ত বিরোধও সংঘর্ষের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গবেষণাটি আসকের তথ্য থেকে আলাদা উৎস ও পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। তাই দুই প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না।
তবে গবেষণার বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক সুযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সরকারি ক্ষমতাকেন্দ্রে প্রবেশের পথ তৈরি করে। ফলে দলীয় পদ বা এলাকার নিয়ন্ত্রণের লড়াই কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে আর্থিক স্বার্থও জড়িয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক নেতারা একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরও স্থানীয় পর্যায়ে জমি, ব্যবসা, ঠিকাদারি ও বিভিন্ন প্রভাবশালী অবস্থান নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকে।
এ ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য। খেলার মাঠ বা কৃত্রিম ঘাসের টার্ফের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির দুটি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে জুবায়ের উদ্দিন বাবু নিহত হন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। দৈনিক প্রথম আলো চট্টগ্রামে হত্যা, হামলা, সংঘর্ষ ও জমি দখলসংক্রান্ত ১৫টি ঘটনা পর্যালোচনা করে। তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে, সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন অবৈধ আয়ের উৎস ও ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে হাতবদলের অভিযোগ সামনে এসেছে।
পরিবহন, বাজার, জমি এবং রেলওয়ের ঠিকাদারিসহ বিভিন্ন খাতকে কেন্দ্র করে এসব বিরোধ তৈরি হয়। আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু নেটওয়ার্ক দখলের অভিযোগ ওঠে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
এসব ঘটনা ঘটে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, যখন বিএনপি জাতীয় ক্ষমতায় ছিল না।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০১৫ সালে দলটির বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে ১৯২টি সংঘর্ষের ঘটনা নথিবদ্ধ করে আসক। এসব ঘটনায় ৪০ জন নিহত হন। দলটির যুবসংগঠন যুবদলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে আরও আটজনের মৃত্যু হয়।
ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতার ৪০১টি ঘটনায় মোট ১০২ জন নিহত হওয়ার তথ্য নথিবদ্ধ করেছিল সংস্থাটি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়। দলটি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের বিকল্প হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে।
তবে আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এনসিপি-সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষের নয়টি ঘটনায় ১৭১ জন আহত এবং পাঁচজন নিহত হন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও ২৯টি সংঘর্ষের ঘটনায় ২২০ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এসব ঘটনার বেশিরভাগই ছিল বিএনপির সঙ্গে সংঘর্ষ।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন দল ও নেতৃত্ব সামনে এলেও সংঘর্ষের প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও বেড়েছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দলের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন নিহত এবং ৫২০ জন আহত হন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ধরনের সংঘর্ষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৭টিতে। এসব ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ১ হাজার ৫৪ জন আহত হন। একই সময়ের আসকের তালিকায় ‘দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলি’ শিরোনামের একটি পৃথক শ্রেণিতে ৫১ জনের মৃত্যুর তথ্যও রয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরাসরি দলটির সরকারের ওপর বর্তায়।
দলটির নেতারাও চাঁদাবাজি, জমি দখল ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। অক্টোবরে এক সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে।
চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনারও জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না। দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে মামলা ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে তাঁর বক্তব্য।
তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এমন ঘটনাও উঠে এসেছে, যেখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার কিংবা সংশ্লিষ্ট কমিটি বিলুপ্ত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এম. মনিরুজ্জামান ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘Party Politics and Political Violence in Bangladesh: Issues, Manifestation and Consequences’ গবেষণায় একটি চক্রের কথা উল্লেখ করেন।
তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বৈরিতা বাড়িয়ে দেয়। এতে সমঝোতা ও আপসের সুযোগ কমে আসে।
সরকারগুলো অনেক সময় বিরোধী পক্ষকে দমনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো আন্দোলন ও পাল্টা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায়। এভাবে সহিংসতা একদিকে রাজনৈতিক সংঘাতের ফল হয়ে ওঠে, অন্যদিকে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণও তৈরি করে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বারবার সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে বলপ্রয়োগকে দাবি আদায়ের স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও এ ধরনের চর্চার পুনরাবৃত্তি ঘটে।
এর ফলে সহনশীলতা, জবাবদিহি এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার মতো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা দুর্বল হয়ে পড়ে।
গত দুই দশকের বেশি সময়ের পরিসংখ্যান একটি বিষয় সামনে আনে—বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো একটি দল বা সরকারের সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাত্রায় ফিরে এসেছে।
জাতীয় রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচনের সময় প্রাণহানির ঘটনা বেড়েছে। অন্যদিকে তুলনামূলক শান্ত সময়ে দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, স্থানীয় আধিপত্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের লড়াই সহিংসতার অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে।
তবে সব সরকারের সময়ের সহিংসতার ধরন ও মাত্রা এক নয়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়নকে সাধারণ দলীয় সংঘর্ষের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক তদন্তে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর তথ্য উঠে আসে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাতিসংঘ জানায়, জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে আন্দোলন দমনে পরিকল্পিত ও ব্যাপক বলপ্রয়োগের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
অন্যদিকে, আসকের ২০২৪ সালের সাধারণ রাজনৈতিক সহিংসতার হিসাবে ১০০ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। এই সংখ্যা পুরো গণঅভ্যুত্থানে নিহত মানুষের সংখ্যা নয়। কারণ আন্দোলনের সময়কার মৃত্যুগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সুতরাং, সরকার পরিবর্তনের পরও রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত থাকার পেছনে স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো, অর্থনৈতিক স্বার্থ, দলীয় আধিপত্য এবং জবাবদিহির ঘাটতির মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে দলীয় সতর্কবার্তা, বহিষ্কার এবং পুলিশের গ্রেপ্তারের মতো পদক্ষেপ দেখা গেছে। কিন্তু সহিংসতা অব্যাহত থাকায় এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা মূল্যায়নের জন্য আরও সময় ও তথ্য প্রয়োজন।
দুই দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল সরকার বা জাতীয় নেতৃত্ব পরিবর্তন করলেই রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান ঘটে না। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, দলীয় কোন্দল এবং অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সহিংসতার এই চক্র চলতেই পারে।
মন্তব্য করুন