ইসলামে জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। মুসলমানদের কাছে এটি সাপ্তাহিক ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ সুযোগ। এ দিনে জুমার নামাজ আদায়ের পাশাপাশি কিছু সুন্নত ও নফল আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা যায়।
জুমার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে নামাজ ও দোয়া—দিনটির বিভিন্ন সময়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু করণীয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক, জুমার দিনের ১০টি আমল।
ইসলামে পরিচ্ছন্নতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, বগল ও নাভির নিচের অবাঞ্ছিত পশম পরিষ্কার করা মানুষের স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতার অংশ। মহানবী (সা.) এগুলোকে ফিতরাতের পাঁচটি কাজের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৮৯)
জুমার দিন মসজিদে যাওয়ার আগে শরীর ও পোশাক পরিচ্ছন্ন রাখা উচিত। তবে নখ কাটার জন্য বিশেষভাবে শুক্রবারকেই নির্ধারিত সুন্নত মনে করার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিলের বিষয়টি আলাদা।
জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো গোসল করা। মসজিদে মুসল্লিদের সমাগম হয় বলে শরীর পরিচ্ছন্ন রাখা এবং দুর্গন্ধমুক্ত থাকা জরুরি।
মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ জুমার নামাজে আসতে চাইলে সে যেন গোসল করে নেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৪৪)
তাই জুমার নামাজের আগে ভালোভাবে গোসল করে পরিচ্ছন্ন পোশাকে মসজিদে যাওয়া উত্তম।
জুমার দিনে পরিষ্কার ও পরিপাটি পোশাক পরা, দাঁত পরিষ্কারের জন্য মিসওয়াক করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সুগন্ধি ব্যবহার করা উত্তম।
মহানবী (সা.) জুমার দিনের গোসল, মিসওয়াক ও সুগন্ধি ব্যবহারের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮০)
এসব আমল ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি মসজিদে অন্য মুসল্লিদের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টিও নিশ্চিত করে।
জুমার দিনের একটি প্রসিদ্ধ আমল হলো সুরা কাহফ পাঠ করা। এ সুরায় ঈমান রক্ষা, দুনিয়ার পরীক্ষা, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর ভরসার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি জুমার দিনে সুরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে বিশেষ নূর বা আলোর ব্যবস্থা করা হবে। (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৩৩৯২)
তাই সম্ভব হলে জুমার দিনে পুরো সুরাটি অর্থসহ পড়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।
জুমার দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে।
তিনি বলেছেন, জুমার দিন তোমাদের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি। এ দিনে তাঁর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে বলেছেন, কারণ উম্মতের দরুদ তাঁর কাছে পেশ করা হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)
তাই দিনের বিভিন্ন সময়ে দরুদ পাঠের অভ্যাস করা উচিত।
জুমার নামাজের জন্য আগে আগে মসজিদে যাওয়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, জুমার দিন ফেরেশতারা মসজিদের দরজায় অবস্থান করে আগমনকারীদের নাম পর্যায়ক্রমে লিখতে থাকেন।
যে ব্যক্তি প্রথমে আসে, সে একটি উট কোরবানি করার সমপরিমাণ সওয়াব পায়। এরপর আগমনকারীরা যথাক্রমে গরু, দুম্বা, মুরগি ও ডিম দান করার সমপরিমাণ সওয়াব পায়। ইমাম খুতবার জন্য বের হলে ফেরেশতারা তাঁদের তালিকা বন্ধ করে খুতবা শুনতে বসেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮১)
তাই শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়া না করে যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে মসজিদে যাওয়া ভালো।
মসজিদে যাওয়ার জন্য দূরত্ব ও শারীরিক সামর্থ্য বিবেচনায় সম্ভব হলে হেঁটে যাওয়া যেতে পারে। এতে শরীরচর্চার পাশাপাশি হাদিসে বর্ণিত পদক্ষেপের সওয়াবও অর্জনের আশা করা যায়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঘরে সুন্দরভাবে অজু করে ফরজ নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে যায়, তার এক পদক্ষেপে একটি পাপ মুছে যায় এবং অন্য পদক্ষেপে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৬৬)
জুমার নামাজের আগে ইমামের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খুতবা চলাকালে কথা বলা বা অন্যের মনোযোগ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ইমাম যখন খুতবা দেন, তখন কাউকে ‘চুপ করো’ বললেও অনর্থক কাজ করা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪)
তাই খুতবার সময় নীরব থেকে মনোযোগ দিয়ে খতিবের বক্তব্য শোনা উচিত।
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটি হলো জুমার নামাজ। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও শরিয়তের শর্ত পূরণকারী মুসলিম পুরুষের ওপর জুমার নামাজ ফরজ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ করো। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ৯)
তাই যথাসময়ে মসজিদে উপস্থিত হয়ে খুতবা শোনা এবং জামাতের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা উচিত।
জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু চাইলে আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন—এ মর্মে হাদিসে বর্ণনা এসেছে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, কোনো মুসলিম নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তিনি তাকে তা দান করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫)
এই সময়টি কখন, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। একটি প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, আসরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দোয়া করা উচিত। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮)
তাই জুমার দিনে বিশেষ করে আসরের পর বেশি বেশি দোয়া, জিকির ও ইস্তিগফার করা যেতে পারে।
জুমার দিনকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে ইবাদত, পরিচ্ছন্নতা, দরুদ, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে অর্থবহ করে তোলা উচিত। নিয়মিত এসব আমলের অভ্যাস একজন মুমিনের আত্মিক উন্নতি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে।
মন্তব্য করুন