পবিত্র রমজান শুরু হতে এখনো প্রায় ১০০ দিন বাকি। তবে রোজা শুরুর অপেক্ষায় না থেকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে। ঘুম, খাবার, শরীরচর্চা ও ইবাদতের অভ্যাসে ধীরে ধীরে কিছু পরিবর্তন আনলে রমজান মাসে নতুন রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বিশেষজ্ঞদের মতে, রমজানের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে একসঙ্গে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় ছোট ছোট অভ্যাস যুক্ত করাই বেশি কার্যকর। এতে ২০২৭ সালের রমজান শুরু হওয়ার আগেই শরীর ও মন নতুন রুটিনের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠবে।
দুবাইভিত্তিক আলেম ও এনজিএসের ইমাম শেখ আয়াজ হাউজে মনে করেন, রমজানের প্রথম দিন থেকে হঠাৎ করে ইবাদতের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা না করে এখন থেকেই অল্প অল্প করে অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায়, কোরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা যেতে পারে।
১. নিয়মিত ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তুলুন
রমজানের প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হতে পারে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায়ের অভ্যাস তৈরি করা। পাশাপাশি প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত ও এর অর্থ নিয়ে চিন্তা করার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা যেতে পারে। ইবাদতকে শুধু অবসর সময়ের কাজ হিসেবে না দেখে প্রতিদিনের জীবনযাত্রার একটি নিয়মিত অংশ করে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন শেখ আয়াজ।
তার ভাষায়, আগামী ১০০ দিনের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ নিখুঁত করে ফেলতে হবে—এমন কোনো বিষয় নেই। অনেকেই রাতারাতি সবকিছু বদলে ফেলার চেষ্টা করেন, যা বাস্তবসম্মত নয়। তাই অল্প করে শুরু করে ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া আগের রমজানে ঋতুস্রাব, সাময়িক অসুস্থতা কিংবা ভ্রমণের কারণে যাদের কিছু রোজা বাদ পড়েছে, তারা পরবর্তী রমজানের আগেই সম্ভব হলে সেসব রোজা কাজা করে নিতে পারেন।
২. ঘুম ও খাবারের সময় ঠিক করুন
দুবাইয়ের ইন্টারন্যাশনাল মডার্ন হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল ডায়েটেটিকস বিভাগের স্বপ্না মেরি জনের পরামর্শ, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে ধীরে ধীরে। শুরুতেই কঠোর ডায়েট বা বড় ধরনের রুটিন পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। প্রথমে প্রতিদিন খাবারের নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা, অপ্রয়োজনীয় নাশতা কমানো এবং রাতে দেরি করে ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাস পরিহার করা যেতে পারে।
রমজান যত ঘনিয়ে আসবে, ততই ধীরে ধীরে ঘুমানোর ও ঘুম থেকে ওঠার সময় পরিবর্তন করা ভালো। এতে সাহ্রি ও ইফতারের সময়ের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়া সহজ হবে। পাশাপাশি দিনের বিভিন্ন সময়ে পর্যাপ্ত পানি পান এবং অতিরিক্ত লবণযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
যারা প্রতিদিন একাধিক কাপ চা বা কফি পান করেন, তাদেরও এখন থেকেই ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ কমানো উচিত। কারণ রমজান শুরু হওয়ার পর হঠাৎ চা-কফি বন্ধ করলে মাথাব্যথা, ক্লান্তি ও বিরক্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৩. সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন
রমজানের আগের সময়টুকু স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। প্রতিদিনের খাবারে আঁশযুক্ত খাবার, চর্বিহীন প্রোটিন, ফলমূল ও শাকসবজি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন স্বপ্না মেরি জন।
এ ধরনের খাবারের অভ্যাস রমজানে স্বাস্থ্যকর সাহ্রি ও ইফতার গ্রহণেও সহায়তা করবে। সাহ্রির খাবারে ওটস, আটার রুটি, ডিম, দই, ডাল ও শাকসবজি রাখা যেতে পারে। এসব খাবার থেকে শরীর প্রয়োজনীয় শর্করা, প্রোটিন ও আঁশ পেতে পারে।
অন্যদিকে ইফতারে শাকসবজি, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং পরিমিত পরিমাণ শস্যজাতীয় খাবার রাখা ভালো। এতে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টিজাতীয় খাবারের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কোমল পানীয়, মিষ্টান্ন ও ঘন ঘন নাশতা খাওয়ার অভ্যাসও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে।
তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় কম খাওয়া নয়। বরং শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং এমন একটি রুটিন তৈরি করা, যা পুরো রমজানজুড়ে ধরে রাখা সম্ভব।
৪. শরীরচর্চা চালিয়ে যান
রমজানের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ব্যায়াম বন্ধ করার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন দুবাইয়ের এনএমসি স্পেশালিটি হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধার্থ জয়মোহন উন্নিথান। তার মতে, দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো ও হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে। তবে হঠাৎ করে ব্যায়ামের সময় বা তীব্রতা বাড়ানো ঠিক হবে না।
শরীরের নমনীয়তা বাড়ানোর ব্যায়াম এবং পেশি শক্তিশালী করার অনুশীলনও রুটিনে রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা বা শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার অভ্যাস এড়িয়ে চলা উচিত।
রমজানে ইফতারের আগে হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক বা শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের জন্য ইফতারের এক থেকে দুই ঘণ্টা পরের সময়টি বেছে নেওয়া ভালো।
যাদের আগে থেকে আঘাতজনিত সমস্যা বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগ রয়েছে, তাদের ব্যায়ামের রুটিন শুরু কিংবা পরিবর্তনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৫. শারীরিক সমস্যা থাকলে আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
যাদের আগে থেকেই কোনো শারীরিক অসুস্থতা রয়েছে, নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয় কিংবা আঘাতজনিত সমস্যা আছে, তাদের রোজা রাখা ও ব্যায়ামের রুটিন পরিবর্তনের বিষয়ে আগেভাগেই চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
চিকিৎসক সিদ্ধার্থ জয়মোহন উন্নিথান সতর্ক করে বলেছেন, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়, বুকে ব্যথা, বিভ্রান্তি, অনবরত বমি কিংবা তীব্র মাথাব্যথার মতো উপসর্গকে রোজার স্বাভাবিক প্রভাব ভেবে অবহেলা করা যাবে না। এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, রমজানের আগের এই সময়টুকু কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরি করা। রোজার প্রথম দিন যেন নতুন জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার লড়াই শুরু না হয়। বরং নিয়মিত ইবাদত, পরিমিত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম ও শরীরচর্চার অভ্যাস এখন থেকেই গড়ে তুললে পবিত্র রমজানকে আরও সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দ্যময়ভাবে কাটানো সম্ভব হবে।
মন্তব্য করুন