বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বন্ধু-স্বজনের বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—খাবার খাওয়ার পর আয়োজককে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? কেউ সৌজন্যবশত কিছু অর্থ দিতে চান, আবার কেউ মনে করেন, দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া ঠিক নয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি নির্ভর করে অর্থ দেওয়ার উদ্দেশ্য, আয়োজকের সম্মতি এবং প্রচলিত রীতির ওপর। অতিথিকে সম্মান করা ও মেহমানদারি করা ইসলামে প্রশংসনীয় কাজ। একইভাবে দাওয়াত খাওয়ার পর স্বেচ্ছায় টাকা বা উপহার দেওয়াও নিষিদ্ধ নয়। তবে সেটি খাবারের মূল্য হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, নাকি উপহার বা সহযোগিতা হিসেবে—তা গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে তা বৈধ।’
অন্যদিকে, সহিহ বুখারির ৬১৩৫ নম্বর হাদিসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।’
হাদিসে অতিথিকে এক দিন ও এক রাত বিশেষভাবে আপ্যায়ন এবং তিন দিন পর্যন্ত মেহমানদারির কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, অতিথিকে আপ্যায়ন করা আয়োজকের পক্ষ থেকে সম্মান ও উত্তম আচরণের অংশ। সাধারণ দাওয়াতের ক্ষেত্রে এটি খাবারের বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার বিষয় নয়।
ইসলামে উপহার দেওয়া ও গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) উপহার গ্রহণ করতেন এবং এর প্রতিদানও দিতেন। সহিহ বুখারির ২৫৮৫ নম্বর হাদিসে এ বর্ণনা এসেছে।
তাই দাওয়াত খেয়ে খুশি হয়ে আয়োজককে স্বেচ্ছায় অর্থ বা উপহার দিলে তা বৈধ হওয়ার পক্ষে এই হাদিস থেকে সমর্থন পাওয়া যায়।
হানাফি ফিকাহর আলোচনায়ও উপহার দেওয়া ও গ্রহণ করাকে উত্তম সামাজিক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। উপহার মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় করে। তবে উপহার এমন হওয়া উচিত নয়, যা দাতা বা গ্রহীতার ওপর অযথা আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
দাওয়াত খাওয়ার পর অর্থ দেওয়া বা নেওয়ার বিষয়টি কয়েকটি পরিস্থিতিতে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
১. স্বেচ্ছায় অর্থ দেওয়া: দাওয়াত খেয়ে খুশি হয়ে কিংবা আয়োজকের খরচে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে নিজের ইচ্ছায় টাকা দিলে তা উপহার বা সহযোগিতা হিসেবে জায়েজ।
২. আগে থেকে অর্থ দেওয়ার শর্ত থাকলে: দাওয়াতের আগে জানানো হয় যে প্রত্যেক অতিথিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতে হবে, তাহলে সেটি পারস্পরিক সম্মতিতে আয়োজিত খাবারের অনুষ্ঠান বা যৌথ খরচের বিষয়। তবে সম্মতি ছাড়া কাউকে অর্থ দিতে বাধ্য করা যাবে না।
৩. আয়োজক টাকা চাইলে: সাধারণ দাওয়াতের পর খাবারের মূল্য দাবি করা এবং আগে থেকে সম্মত হওয়া অর্থ চাওয়া এক বিষয় নয়। আগে থেকে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা না থাকলে অতিথির ওপর খাবারের মূল্য পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না।
৪. সামাজিক চাপের কারণে টাকা দেওয়া: লজ্জা, লোকদেখানো কিংবা সামাজিক চাপের কারণে অর্থ দিতে হলে সেটিকে প্রকৃত স্বেচ্ছা উপহার বলা যায় না। উপহার হওয়া উচিত আন্তরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত।
হানাফি ফিকাহবিষয়ক দারুল ইফতা বার্মিংহামের একটি ফতোয়ায় সাধারণ দাওয়াত ও বিয়ের দাওয়াতে অংশগ্রহণের বিধান ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে, দারুল ইফতা জাম্বিয়ার একটি ফতোয়ায় খাবারের আয়োজন এবং মাথাপিছু খরচের ক্ষেত্রে পূর্বসম্মতির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
এসব আলোচনার মূল বিষয় হলো, দাওয়াতের ধরন এবং অর্থ লেনদেনের শর্ত আগে থেকে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। সাধারণ আপ্যায়নকে পরে গিয়ে বাধ্যতামূলক অর্থ পরিশোধের বিষয়ে পরিণত করা ঠিক নয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে দাওয়াত খেয়ে আয়োজককে স্বেচ্ছায় টাকা বা উপহার দেওয়া জায়েজ। তবে আগে থেকে কোনো সমঝোতা না থাকলে এটিকে খাবারের বাধ্যতামূলক মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
একইভাবে, সাধারণ দাওয়াতের পর আয়োজকেরও অতিথির কাছে খাবারের মূল্য দাবি করার অধিকার তৈরি হয় না। অর্থাৎ, স্বেচ্ছায় উপহার দেওয়া এবং বাধ্যতামূলকভাবে খাবারের দাম পরিশোধ করা—দুটি আলাদা বিষয়।
মন্তব্য করুন