খরচের চাপে বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন যেন এক অদৃশ্য সংকটে আটকে গেছে। প্রতিদিন বাজারে ঢুকলেই নতুন করে দামের ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে, যা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি হাসপাতালের বিল, শিক্ষা ব্যয়, যাতায়াত খরচ ও বাসাভাড়া—সবকিছুরই দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অথচ সেই তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না, ফলে বাস্তব আয় কমে গিয়ে জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারের পণ্যের দামে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পরিবহন ও রাইড শেয়ারিং খাতে যুক্ত প্রায় ১০ লাখ মানুষ। পাঠাও ও উবারসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের চালকদের বড় একটি অংশ এখন আয় কমে যাওয়ার কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তেল নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় তাদের কাজের সময় কমে যাচ্ছে, যা সরাসরি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শপিং মল ও মার্কেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এতে বিক্রি কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কম কিনছেন, কেউ কেউ আবার খালি হাতেই ফিরে আসছেন। পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই এখন অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসা খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ছেন। অনেক পরিবার ঋণ নিয়ে চিকিৎসা চালাতে বাধ্য হচ্ছে, পরে সেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে জমিজমা বিক্রি পর্যন্ত করতে হচ্ছে। তবুও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা মিলছে না, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
শিশুস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৭ শিশুর মৃত্যু এবং উপসর্গ নিয়ে আরও ১৭৪ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা স্বাস্থ্যখাতের নাজুক অবস্থা নির্দেশ করে।
শিক্ষা খাতেও একই সংকট দেখা যাচ্ছে। স্কুলের বেতন, কোচিং, প্রাইভেট টিউশন ও বইয়ের খরচ ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফলে অনেক নিম্নআয়ের পরিবার সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী কোনো না কোনো পর্যায়ে ঝরে পড়ছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ দারিদ্র্য। এমনকি প্রায় ৭ শতাংশ পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বাসাভাড়া, যাতায়াত ব্যয় এবং অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ বাড়ায় বেসরকারি চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। বেতন না বাড়লেও মাসিক ব্যয় বাড়তেই থাকায় অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন, আবার কেউ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাস্তব জীবনে এর প্রভাব তেমন কমেনি। মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ৮.৭১ শতাংশে নেমে এলেও তা এখনও মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে রয়েছে। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মানও অবনতি হচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এটি একটি কঠিন সময়, যা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
মন্তব্য করুন