দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান উৎস বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে বড় ধরনের ধস নেমেছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাস শেষে বেসরকারি খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৬৭২ কোটি টাকা, যেখানে এক বছর আগে এই অঙ্ক ছিল ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারিতেও এই প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরেই সীমাবদ্ধ ছিল, যা আগে থেকেই নিম্নমুখী ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ সুদহার, আস্থা সংকট, খেলাপি ঋণের চাপ এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভোক্তা চাহিদা না বাড়ায় নতুন বিনিয়োগ বা কারখানা সম্প্রসারণে ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। এর সঙ্গে জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতাও ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও চাপের মুখে ফেলেছে।
নিট পোশাকশিল্প খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, উচ্চ সুদহারের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের মতে, বিনিয়োগ সচল রাখতে সুদহার সহনীয় পর্যায়ে আনা জরুরি।
এদিকে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমলেও সরকারের ব্যাংকঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি খাতে চলে যাচ্ছে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নত করতে কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণসীমা বৃদ্ধি, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য পুনর্গঠন সুবিধা এবং বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং অর্থনীতিতে স্থবিরতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মন্তব্য করুন